সংস্কারে পেছালে অর্থনীতির সংকট আরও বাড়বে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৪ জুন ২০২৩ | ০৩:৩০
প্রায় দেড় বছর ধরে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু এ থেকে উত্তরণে তেমন কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে সংস্কার কার্যক্রম থেকে সরকার আরও পিছিয়ে গেলে অর্থনীতির সংকট প্রকট হতে পারে।
ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। আর আইএমএফ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে সাময়িক হিসাবে প্রথম ১১ মাসে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।
পিআরআইর প্রাক্কলন হচ্ছে, এই অর্থবছরে মোট ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আসতে পারে। সে হিসাবে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে থাকবে এনবিআর। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অন্যতম শর্ত হচ্ছে, আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়াতে হবে। এ জন্য আগামী অর্থবছর এনবিআরকে অন্তত ৪ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করতে হবে। সরকার অবশ্য প্রস্তাবিত বাজেটে সংস্থাটির জন্য লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব খাতে বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এটি সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ হয় না। তাই বাজেট ঘাটতি মেটাতে স্থানীয় ঋণের পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে পরের পাঁচ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ২০৮ শতাংশ। এ জন্য চলতি অর্থবছর এ খাতে সুদ পরিশোধ করতে হবে ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়াবে ১২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের সুদ বাবদ আগামী অর্থবছর সরকারকে পরিশোধ করতে হবে প্রায় ৯৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এই প্রবণতা সরকারের সার্বিক ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, জিডিপির ৫ শতাংশ হারে বাজেট ঘাটতি স্বাভাবিক বলে ধরা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ঘাটতি সামষ্টিক অর্থনীতির সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এ জন্য সরকারের প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ব্যয় কমানো যেতে পারে। অর্থনীতির এ ক্রান্তিকালে জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বাদ দিয়ে এসব সংস্কারের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকঋণের সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার সুপারিশ করেন।
তিনি বলেন, গত ৫০ বছরে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যা ঋণ নিয়েছে, তার চেয়ে বেশি নিয়েছে চলতি বাজেটে। গত অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৪৮ হাজার ১৪৩ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিল সরকার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে নিয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। তাই ঋণ কম নিয়ে সরকারের খরচ কমানো এবং করের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, গত ১০ মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ক্ষয় হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
তাঁর মতে, সামষ্টিক অর্থনীতি এখন চাপে রয়েছে। তবে এখনও ভালো ব্যবস্থাপনায় এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু প্রায় দেড় বছর আগে অর্থনীতিতে সংকট শুরু হলেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আগামীতে জাতীয় নির্বাচনের কারণে যদি আর্থিক খাতের সংস্কার কার্যক্রম থেকে সরকার আরও পিছিয়ে যায়, তাহলে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়বে।
