বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন
ফাইল ছবি
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২০ | ১৪:৫৫
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও উদ্যোগে ঋণপ্রবাহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে গত এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে এক বছর আগের চেয়ে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৮২ শতাংশে। এই ঋণ প্রবৃদ্ধি গত প্রায় ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। করোনাভাইরাসের কারণে মে মাসেও অধিকাংশ ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমবে বলে ধারণা ব্যাংকারদের। বেসরকারি খাতের ঋণে খারাপ অবস্থার বিপরীতে অবশ্য সরকারের ঋণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে ব্যাংক থেকে সরকার ৬৪ হাজার ২৯৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। গত অর্থবছরের তুলনায় যা ৩৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি।
চলতি অর্থবছরের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয় ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি হয় ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ। এর আগের অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। গত মার্চে যা ছিল ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আর ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের শুধু মে মাসে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ৬ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। আর চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে গত ৩১ মে পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছর শেষে ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণ ছিল এক লাখ ৮ হাজার ৯৬ টাকা। এতে করে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সরকারের ঋণ ৩৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়ে এক লাখ ৭২ হাজার ৩৯২ কোটি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রয়েছে বেসরকারি খাতের। এখানে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারবাহিকভাবে কমে যাওয়ার মানে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। এই অবস্থা প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন ও সেবা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। করোনাভাইরাসের কারণে সামনে আরও খারাপ হতে পারে। অন্যদিকে সরকারের এখন যে খরচ হচ্ছে তার বিপরীতে কোনো পণ্য বা সেবা বাজারে আসছে না। ফলে মূল্যস্টম্ফীতির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আবার বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আর সরকার যেসব খরচ করছে সেখানে জবাবদিহি অনেক কম। এ অবস্থায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ কমিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী সমকালকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ। এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম হওয়া স্বাভাবিক। আবার সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ঋণ না নিয়েও উপায় নেই। তবে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে বলে তিনি আশা করেন। এর অন্যতম কারণ, এখানে প্রচুর মানুষ থাকায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনেক বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে এমনিতেই রাজস্ব আদায়ে খুব খারাপ অবস্থা। এর মধ্যে করোনাভাইরাসের কারণে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। আবার সঞ্চয়পত্র থেকেও সেভাবে ঋণ পাচ্ছে না সরকার। অথচ নিয়মিত ব্যয়ের পাশাপাশি করোনাভাইরাসের সংকট মোকাবিলায় প্রচুর ব্যয় হচ্ছে। এ অবস্থায় ঋণ করেই চলতে হচ্ছে সরকারকে। এরই মধ্যে বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেও নিতে হচ্ছে।
দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির বড় অংশই আসে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এর আগে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। এরপর থেকে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত টানা ৯ বছর প্রতি মাসে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশের ওপরে। দীর্ঘ সময় পর গত নভেম্বরে প্রবৃদ্ধি কমে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশে নামে। গত ডিসেম্বরে আরও কমে ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ হয়।