বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান প্রতিবন্ধকতা আস্থার সংকট
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কম আসার অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সব পর্যায়ে অবকাঠামো অপ্রতুলতা, দ্বৈত করনীতি, আগে থেকে অনুমান করা যায় না এমন নীতি, কাস্টমস জটিলতা, ব্যবসা পরিচালনায় পদে পদে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতার নাম আস্থার সংকট। বিনিয়োগসহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে অনেক সংস্কার প্রতিশ্রুতি থাকে। বাস্তবে কাজের কাজ তেমন কিছু হয় না। বছরের পর বছর ধরে এই বাস্তবতার কারণে বিদেশি উদ্যোক্তারা এ দেশে বিনিয়োগে আস্থা পান না।
‘বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন: নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ও আগামী বাজেটের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক সংলাপে গতকাল বুধবার এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। রাজধানীর গুলশানে এমসিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. মাসরুর রিয়াজ।
সংলাপে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (ইউরোচ্যাম) সভাপতি নুরিয়া লোপেজ বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজের কাজ কিছু হয় না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, করপোরেট কর কমানোর আশ্বাস দেওয়া হয়, অথচ বাস্তবে আরও বেড়ে যায়। যারা কমপ্লায়েন্ট বা রীতিনীতি মেনে চলে তাদের ওপরই করের বোঝা চাপানো হয়। ডিজিটাল ট্যাক্সেশনের কথা বলা হয়, অথচ আসে কাগজ। বছরে পর বছর ধরে কথায় আর কাজ মিল না থাকায় বিনিয়োগকারীরা আস্থার সংকট ভোগেন।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার পরামর্শ দেন তিনি। নুরিয়া লোপেজ বলেন, বাংলাদেশকে অবশ্যই ইইউর সঙ্গে এফটিএ করতে হবে। কারণ, ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে ইইউর এফটিএ আছে। যেখানে এই দেশগুলোর উৎপাদিত পণ্য ইউরোপে রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যায়, সেখানে ইউরোপের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে কোন বিবেচনায় বিনিয়োগ করতে আসবেন।
তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে অবকাঠামো ঘাটতি দূর করতে হবে। জ্বালানি ও বন্দর এর মধ্যে সবচেয়ে মৌলিক দুটি অবকাঠামো। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যদি ৫ মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয় তাহলে গোটা চালানের উৎপাদন নষ্ট হয়।
তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্যা নতুন করে বলার কিছু নেই। ব্যাংক ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি, ঋণের উচ্চ সুদহার–এগুলো বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এসব কারণে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় বেশি, যা বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তবে আশার কথা, বর্তমান সরকার বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী কমিটিতে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করেছে।
আলোচনায় ইউনিলিভার বাংলাদেশের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার জিনিয়া হক বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্য প্রতিযোগী নয়, বরং প্রায় সব প্রক্রিয়ায় জটিলতাই তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ। ইউনিলিভার এদেশে পণ্য উৎপাদনে ৮০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করে থাকে। এসব পণ্য ছাড় করতে কাস্টমসে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। দ্বৈত কর, করনীতির স্থিতিশীলতা না থাকা, অস্বচ্ছ শ্রম আইন ইত্যাদি বাস্তবতায় বিদেশি বিনিয়োগ কীভাবে বাড়বে। বিনিয়োগ বাড়ানোর একটা রোডম্যাপ করার পরামর্শ দেন তিনি।
মূল প্রবন্ধে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত তুলে ধরে ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, গত কয়েক বছর ধরে এফডিআই মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের মতো। অথচ অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের এফডিআই নীতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদার। তারপরও কেন বিনিয়োগ আসছে না তা খুঁজে বের করতে হবে।
এমসিসিআইর সেক্রেটারি জেনারেল ফারুক আহমেদ বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলদেশের এফডিআই চিত্র নিতান্ত হতাশার। নতুন বিনিয়োগ অনেক নিবন্ধন হয়। সেগুলো শেষ পর্যন্ত আর বিনিয়োগ হিসেবে বাস্তবায়ন হতে দেখা যায় না।
- বিষয় :
- বিনিয়োগ
