সাক্ষাৎকার
ওষুধশিল্পে বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ
মুসাওয়াত শামস্ জাহেদী
মুসাওয়াত শামস্ জাহেদী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নেভিয়ান লাইফ সায়েন্স
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৮:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সমকাল: নেভিয়ান লাইফ সায়েন্সের যাত্রা ও পটভূমি সম্পর্কে জানতে চাই।
মুসাওয়াত শামস্ জাহেদী: নেভিয়ান লাইফ সায়েন্স আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি নোভার্টিস বাংলাদেশ হিসেবে পরিচালিত হতো। নোভার্টিস বৈশ্বিকভাবে তাদের শেয়ার কাঠামো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর রেডিয়েন্ট ওই শেয়ার অধিগ্রহণ করে এবং কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে নেভিয়ান রাখা হয়। তবে নাম পরিবর্তন ছাড়া প্রতিষ্ঠানের মূল কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আমাদের কর্মী, উৎপাদন প্রক্রিয়া, প্লান্ট, প্রযুক্তি ও পণ্যের গুণগত মান আগের মতোই রয়েছে। শুধু বোর্ড পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তন এসেছে।
সমকাল: কানাডার বাজারে রপ্তানিতে আপনারা কী ধরনের মডেল ব্যবহার করছেন?
মুসাওয়াত শামস্ জাহেদী: সাধারণত বাংলাদেশের অনেক কোম্পানি বিদেশে নিজেদের ব্র্যান্ডে ওষুধ রপ্তানি করে। আমরা একটু ভিন্ন পথে হেঁটেছি। আমরা মাল্টি-কোম্পানি মাল্টি-কান্ট্রি কোলাবরেশন বা কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং মডেল অনুসরণ করছি। এখানে সুইজারল্যান্ডের স্যান্ডোজের ফর্মুলেশন ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদের কারখানায় ওষুধ উৎপাদন করা হচ্ছে এবং তা সরাসরি কানাডার বাজারে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি নতুন ধরনের উদ্যোগ। উল্লেখ্য, ওষুধ আমদানিতে কানাডা বিশ্বের সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত দেশগুলোর একটি। সেখানে ওষুধ রপ্তানি করতে হলে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।
সমকাল: এই মডেলের বিশেষ সুবিধা কী?
মুসাওয়াত শামস্ জাহেদী: নিজস্ব ব্র্যান্ডে রপ্তানি করতে গেলে বিদেশে আলাদা ইমপোর্টার, ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল ও মার্কেটিং নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হয়। এটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। কিন্তু স্যান্ডোজের মতো একটি বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সঙ্গে কাজ করার ফলে তাদের বিদ্যমান ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এবং বড় বড় ফার্মেসির সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। পাশাপাশি দক্ষ ফার্মাসিস্ট ও জনবলের কারণে আমরা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন করতে পারছি। এটিও বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করছে। প্রচলিত রপ্তানি মডেলে এ দেশের ফার্মা কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্র্যান্ড উৎপাদন করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে বাজারজাত করার চেষ্টা করে। কিন্তু মার্কেট ডেভেলপমেন্ট, ব্র্যান্ড বিল্ডিংয়ের মতো কাজগুলো বাংলাদেশের কোম্পানি বা বিদেশি ছোট ডিস্ট্রিবিউশন পার্টনারদের পক্ষে কার্যকরভাবে করা সম্ভব হয় না। ফলে রপ্তানির গন্তব্য ও আয় সীমিত থেকে যায়। পক্ষান্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মার্কেট পেনিট্রেশন, শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এবং ব্র্যান্ড বিল্ডিং সক্ষমতা রয়েছে। তাদের হয়ে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য বিশ্বের বহু দেশে ওষুধ রপ্তানির নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে।
সমকাল: বর্তমানে কোন কোন দেশে রপ্তানি হচ্ছে?
মুসাওয়াত শামস্ জাহেদী: কানাডার পাশাপাশি আমরা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের অস্ট্রিয়াতেও কাজ করছি। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ রয়েছে। আমরা ধাপে ধাপে আমাদের আন্তর্জাতিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে চাই। রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা অর্জন করা যেমন কঠিন, সেই আস্থা ধরে রাখাটা আরও কঠিন। কোয়ালিটি, ডেটা ইন্টেগ্রিটি, কমপ্লায়েন্স, ডকুমেন্টেশন এসব ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত উন্নতি করতে হয়। এ জন্য নিয়মিতভাবে প্রযুক্তি, পদ্ধতি এবং জনবলে বিনিয়োগ করতে হয় এবং অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কারণ এই খাতে বিনিয়োগের রিটার্ন সাধারণত ধীরগতির।
সমকাল: বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের সম্ভাবনা আপনি কীভাবে দেখছেন?
মুসাওয়াত শামস্ জাহেদী: বাংলাদেশের সামনে খুব বড় সুযোগ রয়েছে। যদি আমরা এই মডেল সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। শুধু কয়েক মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি নয়, আমরা সেটিকে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের পর্যায়ে নিতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে একটি গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত করা। সেটি করা সম্ভব। আমাদের মতো অন্য কোম্পানিগুলো আমাদের এই মডেল ব্যবহার করবে বলে আমরা আশাবাদী।
সমকাল: আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মুসাওয়াত শামস্ জাহেদী: আমরা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিতে চাই যে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের ফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে এবং এখানে সিএমও বা পার্টনারশিপের বড় সুযোগ আছে। আগামী পাঁচ বছরে আমরা রপ্তানি খাতে বড় অবস্থান তৈরি করতে চাই। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জায়গা করে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এই মুহূর্তে কাঁচামাল বা এপিআই উৎপাদনে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেই। আমাদের প্রধান মনোযোগ এখন রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে।
সমকাল: প্রস্তাবিত বাজেটে ওষুধশিল্পের জন্য কোনো সুখবর দেখছেন কি?
মুসাওয়াত শামস্ জাহেদী: প্রস্তাবিত বাজেটে ওষুধশিল্পের জন্য কিছু ইতিবাচক দিক আছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে অতি প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। ওষুধের কাঁচামাল শিল্পের বিকাশে কিছু প্রণোদনা ও কর সুবিধার বিষয়ও রাখা হয়েছে। এগুলো নিঃসন্দেহে স্বাগত উদ্যোগ। এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের বিষয়টিও বাজেট প্রণয়নে বিবেচনায় এসেছে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তবিবুর রহমান
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
