বিদেশি ঋণের সুদাসল পরিশোধ ছাড়াল ৪০০ কোটি ডলার
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৮:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
দীর্ঘ দিন ধরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি বেশ ধীর। এ পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড় কমেছে। কমে গেছে নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতিও। গত মে মাস পর্যন্ত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসে বিদেশি ঋণের সুদাসল পরিশোধ ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে ১১ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড় গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০৩ কোটি ডলার কমেছে। ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার এখন ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। সে হিসাবে, গত ১১ মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে বিদেশি ঋণ কম এসেছে ১২ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সহযোগীদের কাছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের। কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে অর্থছাড় না পাওয়ায় বছরের মাঝপথে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরডিপি) নতুন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৭২ হাজার কোটি টাকা। কমিয়ে আনা লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হচ্ছে না।
গতকাল মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১১ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে অর্থছাড় হয়েছে ৫৬ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। গত ১১ মাসের প্রবণতা অনুযায়ী প্রতি মাসে গড়ে ১০৭ কোটি টাকার মতো এসেছে। অর্থবছরের শেষ মাস চলতি জুন শেষেও একই হারে অর্থছাড় হলে অর্থবছরের মোট বিদেশি ঋণের ছাড় দাঁড়াবে ৫৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকা।
অর্থাৎ অর্থবছর শেষে এডিপিতে বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা থেকে ছাড়ের পরিমাণ ১৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা কম হতে পারে। এ রকম বাস্তবতার মধ্যেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এডিপিতে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বিদেশি ঋণ পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। আর আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মোট বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।
অর্থছাড় কমে আসার পাশাপাশি নতুন করে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও কমিয়েছে উন্নয়ন সহযোগীরা। ইআরডির প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য বলছে, ১১ মাসে প্রতিশ্রুতি কমেছে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২৬ কোটি ডলারেরও বেশি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ৪২২ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। সবচেয়ে বেশি কমেছে অনুদান। চলতি অর্থবছরে অনুদানের প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩৮ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক, প্রায় ৯৬ কোটি ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। দেশটির কাছ থেকে ৯৩ কোটি ডলার পাওয়া গেছে। তৃতীয় সর্বোচ্চ অর্থছাড় এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে, ৭৮ কোটি ডলার। অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে চীন ৫৩ কোটি ডলার, জাপান ৪৩ কোটি ডলার ও ভারত ২৫ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেছে।
উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থছাড় ও নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি অনেক কমলেও পুরোনো ঋণের সুদাসল পরিশোধ বাড়ছেই। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মাসে পরিশোধ বেড়েছে ৩৫ কোটি ডলারের মতো। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫০ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। এটি দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক ঋণের সুদাসল পরিশোধের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড। গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ঋণের সুদ ও আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পরিশোধ বেড়েছে ৩৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার বা প্রায় ৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা।
ঋণ পরিশোধের এই চাপ বাড়ার পেছনে বড় বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের ঋণকে প্রধান কারণ মনে করেন ইআরডির কর্মকর্তারা। এসব ঋণের অনেকগুলোর রেয়াতকাল শেষ হওয়ার পর নিয়মিত কিস্তিতে পরিশোধ করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে ঋণের আসল পরিশোধ করা হয়েছে ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৩৮ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। অন্যদিকে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ১৪৫ কোটি ডলারের মতো, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৪০ কোটি ডলার।
- বিষয় :
- ঋণ
