ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বাড়াতে ৩২৮৭ কোটি টাকার প্রকল্প

সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বাড়াতে ৩২৮৭ কোটি টাকার প্রকল্প
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১০:৪৬ | আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ | ১০:৫৭

সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় জোরদার, তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি বাড়াতে প্রায় তিন হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় নেওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় দেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল রূপান্তর, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করা হবে।

গতকাল রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘স্ট্রেনদেনিং ইনস্টিটিউশনস ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি (সিটা)’ বা ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ’ নামের প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি, কর পরিপালন জোরদার, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এর লক্ষ্য।

প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) দেবে তিন হাজার ৪৩ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকার দেবে ২৪৪ কোটি টাকা। সিটা প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান– পরিকল্পনা বিভাগ, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) অধীন বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (ওসিএজি)।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, সরকারের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে অটোমেশনের আওতায় এনে অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানো, রাজস্ব আদায় সহজ করা এবং তথ্যের স্বচ্ছতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় হবে। হিসাব ও নিরীক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা হবে। মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি পরিমাপের পদ্ধতি উন্নত হবে। প্রকল্প প্রণয়ন ও তদারকি ব্যবস্থায় গতি আসবে এবং ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় বা ই-জিপি আরও আধুনিক হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সিটা প্রকল্পের মাধ্যমে পাঁচটি সংস্থার জনসেবা কার্যক্রম ডিজিটাল করা হবে এবং তথ্যভিত্তিক সমন্বয় জোরদার করা হবে। এর ফলে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়বে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, তথ্য-উপাত্ত, সরকারি ক্রয় এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান বিভিন্ন  দুর্বলতা দেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা সীমিত করছে। এ কারণে সিটা প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বড় ধরনের সংস্কার আনা হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং নীতি নির্ধারণের জন্য উচ্চমানের তথ্য উৎপাদন ও ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়াবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর প্রশাসনকে আরও স্বয়ংক্রিয় করবে। ই-ইনভয়েসিং, সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং অটোমেশনের মাধ্যমে কর পরিপালন বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরিকল্পনা বিভাগ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করবে।

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) ই-জিপি ব্যবস্থায় উন্নত ডিজিটাল সুবিধা যুক্ত করবে, যাতে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়। অন্যদিকে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে (ওসিএজি) নিরীক্ষা প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা হবে এবং আর্থিক তদারকি ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করা হবে। প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরির সময় ৭২ মাস থেকে কমিয়ে মাত্র ৯ মাসে নামিয়ে আনা।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শক্তিশালী ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন, যেগুলোর প্রতি জনগণ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা থাকবে।

এনবিআরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশেরও কম, যা বাড়িয়ে প্রায় ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। তিনি রাজস্ব ফাঁকি রোধ এবং বিভিন্ন সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যে অধিকতর সমন্বয় প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিপিপিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সচিব) এস এম মঈন উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে একটি আধুনিক, নিরাপদ এবং ক্লাউড-প্রস্তুত ই-জিপি ভার্সন ২.০ চালু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। আইএমইডি সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, সিটা প্রকল্পের আওতায় একটি স্বয়ংক্রিয় হিসাব ও নিরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যা সেবাদান ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে।

পরিকল্পনা বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার। অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

×