রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯৩ হাজার কোটি টাকা কম
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১১:২৪
লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায় সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের জন্য পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সাময়িক হিসাবে এর বিপরীতে সংস্থাটি আদায় করতে পেরেছে চার লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। এটি সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ।
তবে লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে থাকলেও রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে এনবিআর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি তিন লাখ ৬৯ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছিল। সেই তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১১ শতাংশ বা ৪০ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা।
গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবদুল্লাহর করা প্রশ্নের লিখিত জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানিয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, সামগ্রিকভাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায় কম হয়েছে ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। তিনি উল্লেখ করেন, এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের সবকটি প্রধান খাতেই এই ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
খাতভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আয়কর খাতে এক লাখ ৮৬ হাজার ১১০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে এক লাখ ৪২ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ আদায় হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার ৭৬ দশমিক ৭ শতাংশ। ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর খাতেও লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৮৬ হাজার ১১০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে এক লাখ ৫৫ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এ ছাড়া শুল্ক খাতে এক লাখ ৩০ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৮৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
এদিকে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল চার লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা, যা পরে সংশোধন করে পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা করা হয়। এনবিআর-বহির্ভূত বিভিন্ন খাত থেকে গত মার্চ পর্যন্ত অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সরকারের আদায় হয়েছে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা। এদিকে সংশোধিত বাজেটে এনবিআরসহ সরকারের মোট রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ে বিশাল এই ঘাটতির মধ্যেই সরকার চলতি অর্থবছর এনবিআরকে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য দিয়েছে।
সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের ভ্যাট-সংক্রান্ত হয়রানি বন্ধ এবং ভ্যাট আদায় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল করতে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়িত উদ্যোগ তুলে ধরেন। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের ভ্যাট-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে আইনগত ও প্রযুক্তিগত ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ হলো ‘ইনস্ট্যান্ট ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন’ প্রদানের লক্ষ্যে আইন সংশোধন করা হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের বিলম্ব ছাড়াই দ্রুত ভ্যাট নিবন্ধন পাচ্ছেন। এ ছাড়া অনলাইনে শতভাগ রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কার সম্পন্ন করা হয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে ইআরপি বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত মূসক সফটওয়্যারের মাধ্যমে সব ব্যবসায়িক দলিলাদি শতভাগ ইলেকট্রনিক উপায়ে সংরক্ষণ করার বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা যাতে ঘরে বসেই সহজে কর পরিশোধ করতে পারেন, সেজন্য ই-চালান ও এ-চালানের মাধ্যমে অনলাইনে ভ্যাট প্রদানের ব্যবস্থা আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে আগামীতে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় ই-ইনভয়েসিং সিস্টেম প্রবর্তন এবং ইআরপি ডেটা সংগ্রহের জন্য এপিআই সিস্টেম চালু করা। কর ফাঁকি রোধে এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে কাস্টমস, ভ্যাট এবং ইনকাম ট্যাক্স বিভাগের মধ্যে একটি সমন্বিত ইলেকট্রনিক ডেটা এক্সচেঞ্জ সিস্টেম চালু করা হবে। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে অন্যান্য সরকারি দপ্তরের আন্তঃকার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধার্থে ইলেকট্রনিক ইন্টারন্যাশনাল ডেটা এক্সচেঞ্জ সিস্টেম প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে।
অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, স্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের রূপান্তরকে গতিশীল করতে সরকার প্রযুক্তি পণ্যের স্থানীয় উৎপাদনে বড় ধরনের কর ছাড় দিয়েছে। কম্পিউটার ও প্রযুক্তি নির্ভর পণ্য যেমন– কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনার, কার্টিজ, কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, ডেস্কটপ, নোটবুক, নোটপ্যাড, মাউস, র্যাম এবং মাদারবোর্ড ইত্যাদির স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে সম্পূর্ণ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ শিল্পকে সুরক্ষার লক্ষ্যে এই ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
- বিষয় :
- এনবিআর