ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

অর্থ সংস্থানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আইএমএফের

অর্থ সংস্থানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আইএমএফের
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও ভর্তুকি ও প্রণোদনায় বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নানা উদ্যোগ রয়েছে। সরকারের এই বাড়তি ব্যয়ের অর্থ সংস্থানের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি উঠে আসে। বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার, খাদ্য ও অন্যান্য খাতে ভর্তুকি নিয়ে আলোচনা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। আগামীকাল বুধবার এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করবে প্রতিনিধি দল।

গতকাল সচিবালয়ে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে। রাতারাতি বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় এবং আইএমএফও এ বিষয়ে একমত হয়েছে। কোন সংস্কার কখন করা প্রয়োজন, সেই অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেই সরকার এগোবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের আর্থিক সংস্কার, রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতির প্রতি আইএমএফ সম্মান জানিয়েছে। নতুন ঋণ কর্মসূচির ভিত্তি ও বাস্তবায়নের ধাপ নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি কোন ভিত্তির ওপর পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পরিষ্কার ধারণা হয়েছে। সরকার যে ভিত্তি ও নীতিমালার প্রস্তাব দিয়েছে, আইএমএফ তাতে একমত হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি রাজনৈতিক সরকারের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে। জনগণের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখেই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ধরনের রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতাকে আইএমএফ গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে এবং সম্মান জানিয়েছে। তিনি জানান, বর্তমান সরকারের চার মাসের কর্মকাণ্ডে আর্থিক খাতের সংস্কার, শেয়ারবাজার ও পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং রাজস্ব আদায়ে যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
ভর্তুকির বিষয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এখনও কোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা বিস্তারিত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি। আপাতত নতুন কর্মসূচির মূল ভিত্তি তৈরির বিষয়েই কথা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনায় এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

এদিকে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তির সময় সরকার ভর্তুকি কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আইএমএফের মতে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি আরও কমানোর সুযোগ রয়েছে। প্রকৃত উপকারভোগীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ব্যয় বাড়ানোর লক্ষ্যে সামগ্রিক ভর্তুকি ও প্রণোদনা কমানোর তাগিদ দিয়ে আসছে সংস্থাটি।
তবে এ খাতে ব্যয় উল্টো বেড়েছে। গত অর্থবছরের চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ খাতে আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যেই বকেয়া ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার কথা থাকলেও বর্তমানে এ খাতে বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। ফলে প্রতিটি আইএমএফ মিশনের সঙ্গে বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংস্থাটির প্রতিনিধি দলের সদস্যরা অসন্তুষ্ট। অবশ্য আগের ঋণের কিস্তি বাদ দিয়ে নতুন করে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের ঋণের জন্য আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বিএনপি সরকার।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরকারিভাবে ভর্তুকি অনুমোদিত নয়, সেসব ক্ষেত্রেও ভর্তুকি অন্তর্ভুক্ত করে বড় অঙ্কের বকেয়া দেখানো হচ্ছে। এসব বিষয় নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে আইএমএফ। কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায় তা নিয়ে আগামীকাল বুধবার বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করবে প্রতিনিধি দল। 
এদিকে চলতি মাস থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এ জন্য বাজেটে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জানা গেছে, গত রোববার অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের পদ্ধতির পাশাপাশি এ খাতে অর্থ সংস্থানের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তোলে প্রতিনিধি দল।
আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে গত দুই দিনের বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এসব বাড়তি ব্যয় নির্বাহে রাজস্ব আয়ের যে পরিকল্পনা সরকারের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়েছে, তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি প্রতিনিধি দল। তাই সরকারের বাড়তি ব্যয়ের অর্থ সংস্থানের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আইএমএফ। 

আরও পড়ুন

×