এডিপি বাস্তবায়নের হার এযাবৎকালের সর্বনিম্ন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের এই হার দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। আর টাকার অঙ্কে যে বাস্তবায়ন হয়েছে সেটি গত ৯ অর্থবছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
গতকাল বৃহস্পতিবার গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়ন সম্পর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। এতে দেখা যায়, সংশোধিত এডিপিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় এক লাখ ৪১ হাজার ৭২ কোটি টাকা। এর আগে টাকার অঙ্কে এর চেয়ে কম আরএডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে ব্যয় হয় এক লাখ ৮৪০ কোটি টাকা।
আইএমইডির বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছর থেকে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের তথ্যউপাত্ত পাওয়া যায়। তাতে দেখা যায়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মতো এত কম বাস্তবায়নের হার আগের কোনো অর্থবছরেই হয়নি।
গত অর্থবছরে মূল এডিপির আকার ছিল দুই লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। এক হাজার ১৯৮টি প্রকল্পের বিপরীতে এ বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বাস্তবায়নের অগ্রগতি অত্যন্ত কম থাকায় সংশোধিত এডিপিতে ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ কমানো হয়। এতে সংশোধিত এডিপি বা আরএডিপির আকার দাঁড়ায় দুই লাখ আট হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা।
বাস্তবায়ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরাদ্দে কাটছাঁটের পরও গত অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির প্রায় ৬৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা অব্যয়িত থেকে গেছে। অর্থাৎ বরাদ্দের এই অর্থ ব্যয় করতে পারেনি মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। অথচ তাদের চাহিদার ভিত্তিতেই বাজেটে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সাম্প্রতিক কোনো অর্থবছরে এত বড় অঙ্কে অর্থ অব্যয়িত থেকে যাওয়ার নজির নেই। এমনকি অতিমারি করোনার বছরও এডিপির আওতায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এতটা কম হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডির) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, উন্নয়ন বরাদ্দের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যয়িত থাকলে অর্থনীতিতে তার বহুমুখী অভিঘাত তৈরি হয়। পরিকল্পনা মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে সেবা সৃষ্টি হয় না, যে সেবা অর্থনীতিতে গতি আনতে পারত।
তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব থেকে প্রকল্পের ব্যয় জোগান দেওয়া হয় না। ঋণ করেই ব্যয় জোগান দিতে হয়। সেটা হয় বিদেশি ঋণ, না হয় দেশীয়। এতে ঋণের চাপ রয়ে যায়। আবার বিলম্বে বাস্তবায়ন করতে প্রকল্পের ব্যয় অনেক বেশি বেড়ে যায়। এ সমস্যার সমাধানের জন্য বাস্তবায়ন সক্ষমতায় যথাযথ মনোযোগ দিতে হবে। বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়েরই নিজস্ব বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন দপ্তর থাকতে পারে। আর কেন্দ্রীয়ভাবে তা দেখতে আইএমইডিকে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী করতে হবে।
পরিকল্পনা কমিশন এবং আইএমইডির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত অর্থবছর এডিপি ব্যয় এতটা কমে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ ছিল সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা সংশোধন। বিধিমালা সংশোধন প্রক্রিয়ায় দুই মাসের মতো সময় লেগেছে। ওই সময়ে অনেক সরকারি দপ্তরে ক্রয় সম্পর্কিত কাজ প্রায় বন্ধ ছিল। এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রকল্প বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এক ধরনের স্থবিরতাও প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে পড়ার অন্যতম বড় কারণ ছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার এত কম হওয়ার আরেকটি কারণ ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কাজে ধীরগতি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালক পালিয়ে যান। নতুন করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে হয়েছে। এতে সময় লেগেছে। অনেক প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে। কিছু প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে। কিছু প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হয়েছে। এ ছাড়া বরাবরের মতো বাস্তবায়নে দক্ষতার ঘাটতি তো আছেই।
আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাস্তবায়ন করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। বিভাগটির বাস্তবায়নের হার মোট বরাদ্দের ৯৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম বাস্তবায়নের হার কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের। এ বিভাগটি সংশোধিত এডিপি বরাদ্দের মাত্র ৫০ দশমিক ৩৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।
- বিষয় :
- এডিপি