নির্ধারিত ভাড়ায় হিমাগার পরিচালনা করা যাচ্ছে না
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
টানা দুই বছর দেশে আলুর উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি। উদ্বৃত্ত সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগারশিল্প গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের সুদ ও কিস্তি, শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় হিমাগার পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ হিমাগার লোকসানের মুখে পড়েছে এবং পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন এসব তথ্য জানিয়ে হিমাগারে পণ্য রাখতে সরকার নির্ধারিত ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। রাজধানীর পুরানা পল্টনে সংগঠনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু।
তিনি বলেন, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আলুর ব্যাপক উৎপাদন হয় এবং এসব এলাকাকে কেন্দ্র করেই দেশের অধিকাংশ হিমাগার গড়ে উঠেছে। ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৭ সালে আলুর বাজারে দরপতনের কারণে বিপুল পরিমাণ সংরক্ষিত আলু বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। সেই আর্থিক ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়, যা দেশের চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৫ লাখ টন বেশি। দেশের ৩৫১টি হিমাগারে প্রায় ৩৪ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়। অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে অনেক কৃষক উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হন। চলতি বছরও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালে দেশে প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে, যা দেশের চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ টন বেশি। এবারও ৩৫১টি হিমাগারে প্রায় ৩৪ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে।
সংগঠনটি জানিয়েছে, চলতি বছরের ১ জুন থেকে হিমাগার শিল্পে ব্যবহৃত বিদ্যুতের বাণিজ্যিক ট্যারিফ ১৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, অ্যামোনিয়া গ্যাস, লুব্রিকেন্ট, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বেড়েছে। এসব ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে আলু সংরক্ষণের ভাড়া সমন্বয় করা হয়নি। ১০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি হিমাগারে ব্যাংকঋণের সুদ ও কিস্তি এবং বিদ্যুৎ ব্যয় মিলিয়ে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে খরচ হয় প্রায় ৭ টাকা ১১ পয়সা। হিমাগারের প্রকৃত ব্যয় প্রতি কেজিতে প্রায় ৯ টাকা ৬২ পয়সা। অথচ সরকার ২০২৫ সালে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করেছে ৬ টাকা ৭৫ পয়সা, যা এখনও বহাল। এই ভাড়া বাড়ানো জরুরি।
মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, এই অবস্থায় অনেক হিমাগার মালিক নিয়মিত ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে তাঁরা ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে পড়ছেন। এ অবস্থায় ভাড়া বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের কিছু দাবি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে–ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষিদের জন্য প্রণোদনা, ব্যক্তিমালিকানাধীন হিমাগারকে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে বিশেষ সুবিধা দেওয়া, বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ রিবেট, কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, আলু রপ্তানিতে প্রণোদনা ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা এবং মৌসুমি বাস্তবতা বিবেচনায় ব্যাংকঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধা দেওয়া। এ ছাড়া আলু সংরক্ষণ ভাড়া নির্ধারণে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে একজন স্বাধীন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা আর্থিক বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
তিনি বলেন, দেশে বছরে আলুর চাহিদা
৯০ থেকে ৯৫ লাখ টন হলেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টন। অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে কৃষক লোকসানে পড়ছেন। তাই কৃষি মন্ত্রণালয়কে অঞ্চলভিত্তিক কোন এলাকায় কত জমিতে আলুর আবাদ হবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে।
- বিষয় :
- আলু