ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

আরসিইপি সদস্যপদ ও এলডিসি উত্তরণে ৩ বছর সময় বৃদ্ধি

নিউজিল্যান্ডের সমর্থন ও দেশটির সঙ্গে এফটিএ করতে চায় বাংলাদেশ

নিউজিল্যান্ডের সমর্থন ও দেশটির সঙ্গে এফটিএ করতে চায় বাংলাদেশ
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:৩১

রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) চুক্তিতে সদস্যপদ লাভ, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণে অতিরিক্ত তিন বছর সময় এবং নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে দেশটির সক্রিয় সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ।

নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটনে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (এমএফএটি) সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন কামনা করে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

বৈঠকে নিউজিল্যান্ডের ট্রেড নেগোসিয়েশনস অ্যান্ড পলিসি ডিভিশনের ডিভিশনাল ম্যানেজার সারা মেম্যান্ড ও ইউনিট ম্যানেজার জোনাস হোল্যান্ডের নেতৃত্বে দেশটির প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান। এতে মন্ত্রণালয়ের এফটিএ উইংয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং ওয়েলিংটনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর ইশতিয়াক আহমেদ অংশ নেন।

বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সরকার ও বাণিজ্যমন্ত্রীর শুভেচ্ছা নিউজিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের জানানো হয়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নিউজিল্যান্ডের ভূমিকার প্রশংসা করে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়।

আরসিইপিতে সদস্যপদে সমর্থন

বৈঠকে আরসিইপিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ জানায়, সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলির বিস্তারিত জবাব ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আরসিইপির উচ্চমানের বাণিজ্যিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বিভিন্ন নীতি ও প্রতিষ্ঠান সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও লজিস্টিকস খাত আরও উন্মুক্ত করা এবং প্রতিযোগিতা, পেটেন্ট, কপিরাইট ও ডেটা সুরক্ষায় আধুনিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়গুলো তুলে ধরে বাংলাদেশ।

আরসিইপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিউজিল্যান্ডের নীতিগত প্রভাবের কথা উল্লেখ করে সদস্যপদ লাভে দেশটির সক্রিয় সমর্থন চাওয়া হয়। একই সঙ্গে সংবেদনশীল পণ্য ও শিল্প খাত সুরক্ষায় আসিয়ানের এলডিসি সদস্যদের মতো ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি পর্যায়ক্রমিক শুল্ক সুবিধার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

এলডিসি উত্তরণে বাড়তি সময়

এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তাও বৈঠকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। ২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়সীমার পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণকাল বাড়ানোর যে আবেদন বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে করেছে, তার পক্ষে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা তুলে ধরে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চাওয়া হয়।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে উন্নয়নশীল এবং উত্তরণপ্রক্রিয়ায় থাকা অর্থনীতিগুলো চাপের মুখে পড়েছে। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তর, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশ জানায়, এলডিসি উত্তরণ অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য নেই। অতিরিক্ত সময়কে টেকসই ও সুসংগঠিত জাতীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতির জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে চায় ঢাকা।

নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে এফটিএ চায় ঢাকা

বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ১৪তম মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলন (এমসি-১৪) সামনে রেখে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের মধ্যে আলোচনার ধারাবাহিকতায় এফটিএ আলোচনার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা নিউজিল্যান্ডকে জানায় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের মতে, এফটিএ হলে নিউজিল্যান্ডের জন্য বাংলাদেশের বড় ভোক্তা বাজারে দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ধাতব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিউজিল্যান্ডের বাজারে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

তিন প্রস্তাব বাংলাদেশের

বৈঠকের শেষ পর্যায়ে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সহযোগিতা আরও গতিশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ।

প্রথমত, আরসিইপিতে এলডিসি-পরবর্তী বাজার সুবিধা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য একটি বার্ষিক ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতি পরামর্শক গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

দ্বিতীয়ত, এফটিএ আলোচনার প্রথম ধাপ হিসেবে দুই দেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

তৃতীয়ত, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময়ের আবেদনের প্রতি সমর্থন নিশ্চিত করতে নিউইয়র্কে দুই দেশের স্থায়ী মিশনের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আশা প্রকাশ করে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের সম্পর্ক বাণিজ্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিনিয়োগ, বাজার সম্প্রসারণ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা পাবে।

বৈঠকে উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ ও উচ্চপর্যায়ের নীতি-সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ শিগগিরইভ নিউজিল্যান্ডের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানায়। এতে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে নিউজিল্যান্ড।

আরও পড়ুন

×