ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

মারের ভাষার বিকল রাজনীতির অবসান চাই

মারের ভাষার বিকল রাজনীতির অবসান চাই
×

কাবেরী গায়েন

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:৫৭ | আপডেট: ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২:৪৭

রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নুরুল হক নুর ও তার অনুসারীদের ওপর হামলার যে ঘটনা ঘটেছে তা যে কাউকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না। এসব ঘটনা নতুন কিছু নয়। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম, দীর্ঘদিন থেকে এখানেই শিক্ষকতা করছি, এর সুবাদে বিভিন্ন সময় এ ধরনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি শুধু তাই নয়, বলতে গেলে এসব অভিজ্ঞতা নিয়েই বড় হয়েছি। নব্বইয়ের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষার্থী জীবনকালে সংঘর্ষের ঘটনা ছিল নিত্যদিনের। হল দখল, চাঁদাবাজি, এমনকি বহু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। তবে ওইসব ঘটনার কোনো বিচার হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই সবার ধারণা, এ ধরনের অপরাধের কোনো বিচার হয় না। 

যে বিশ্ববিদ্যালয় হবার কথা মেধা-মনন চর্চার নির্ভারক্ষেত্র, সেই বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছিল ছাত্রহত্যার নিরাপদ ক্ষেত্র। তবে বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্তদের বহিস্কার, গ্রেপ্তার ও বিচার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করে মানুষের মনে বিচারহীনতার বদ্ধমূল যে ধারণা ছিল, সেই ধারণায় খানিকটা পরিবর্তন এসেছিল। আমরা ভেবেছিলাম, এ ধরনের ঘটনা অন্তত কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন ঘটেনি। ছাত্রলীগ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পরিবর্তে যে সহিংসতা বজায় রেখেছে, ২২ ডিসেম্বরের ঘটনা সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে।

বুয়েটের ঘটনায় একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হলেও আরও ২০ ছাত্রের জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। তারা সবাই মেধাবী ছিল। এই মেধাবী ছাত্ররা সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এসে রাজনীতির ছত্রছায়ায় একসময় দানবে পরিণত হয়েছে। এখন শুধু তাদের শাস্তি নিশ্চিত হলেই যে অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে বিষয়টি এত সরল নয়; বরং এই মেধাবীরা ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় দানবে পরিণত হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সেই প্রক্রিয়া বন্ধ করা দরকার। তা না হলে এ ধরনের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।

ডাকসু ভবনে ভিপির কক্ষে হামলা হয়েছে। দু'জন শিক্ষার্থীকে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে তারা সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এটা খুঁজে বের করতে হবে ক্ষমতাসীনদের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ বা মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ কেন এ হামলা চালাল? তাদের খুঁটির জোর এতই বেশি যে, ইচ্ছে হলেই বা কাউকে পছন্দ না হলেই এভাবে মারতে পারে? আমরা দেখেছি, যখন যে ছাত্রসংগঠন ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট থাকে তারাই এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। হামলার ঘটনায় ছাত্রলীগ ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতারা জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামের কোনো সংগঠন কি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করার কথা? কিন্তু তারা করেছে। এটা নিছকই গুণ্ডামি। 

বলা হচ্ছে, ডাকসুতে বহিরাগতরা এসেছিল- অভিযোগ সত্য হলে প্রশাসনকে জানাতে পারত। কিন্তু তা না করে জমিদারি মনোভাব পোষণ ও মারমুখী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। ভিপি নুর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতারা তাকে দেখতে গেছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই আবার ভিপি নুরকে 'অভিনেতা' বলে সামাজিক মাধ্যমে ট্রল করছেন। আমাদের এমনই বোধবিস্মৃতি ঘটেছে যে, একজন কেউ অভিনেতার মতো আচরণ করলেও যে মারধর করা যায় না, এই স্বাভাবিকবোধ হারিয়ে বসে আছি। আমরা উগ্রতা বা সন্ত্রাসের জায়গায় বারবার ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনকে দেখেছি। তারা কেন এটা করে?

আমরা চাই ছাত্ররাজনীতি বহাল থাক। কিন্তু সেটা হতে হবে শিক্ষার্থীবান্ধব। লুটেরা বা খুনের রাজনীতি নয়। শিক্ষার্থী হয়ে আরেক শিক্ষার্থীকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার মতো দাপট দেখতে চাই না। একটি ক্যাম্পাসে বিভিন্ন মতের মানুষ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষমতার দাপটে কেউ কাউকে আঘাত করবে, আর প্রশাসন সেক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেবে না- এটা অপরাধ। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়; অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে নিত্যই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকেও চাঁদা দিতে হয়েছে। প্রশাসন তাদের তোয়াজ করে টিকে থাকছে। শিক্ষক হিসেবে এ অরাজকতার সমাপ্তি দেখতে চাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এক বছর পর শত বছর পূর্ণ হবে। গৌরবের এই লগ্নে এসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতা বা খুনের রাজনীতি চলতে দেওয়া যায় না। এ ধরনের সহিংসতা থামাতেই হবে। এর জন্য প্রথমত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা অন্যায় করবে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা প্রশাসনের দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাসীন দলকে কথা ও কাজে স্বচ্ছ হতে হবে। কারণ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনই মূলত এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। শুধু মুখে স্বচ্ছতার কথা বলে দায় এড়ানোর দিন শেষ। তৃতীয়ত, ক্যাম্পাসগুলোর ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের ওপরও বর্তায়। তাদের যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত, মুক্তচিন্তার পরিসর বাড়ানো ও সাংস্কৃতিক চর্চা নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হতে হবে সবাইকে। মনে রাখতে হবে, জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক চর্চা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্যু ঘটে।

আজ আমরা এ হামলার যে প্রতিবাদ জানাচ্ছি, কথা বলছি, তা শুধু একজন নুরের জন্য বা তার কিছু সহযোগীর জন্য নয়। বরং আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরকে নির্ভীক দেখতে চাই। এখানে জ্ঞান, মুক্তচিন্তা ও সাংস্কৃতিক চর্চা হবে- এটাই কাম্য। আমরা খুনোখুনি বা উগ্রতা দেখতে চাই না। এটা ভুলে গেলে চলবে না, নুরুল হক নুর শুধু একজন ব্যক্তিই নন, তিনি ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি। অথচ তিনিই বারবার মারধরের শিকার হচ্ছেন। যেখানে ভিপি নিরাপদ নন, সেখানে অন্য শিক্ষার্থীরা কতটুকু স্বস্তিতে রয়েছেন, সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায়। শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে দিন পার করছে, কেউ মত প্রকাশের সাহস পাচ্ছে না। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম-গেস্টরুমের অমানবিক নির্যাতনের কথা জানি। সাধারণত দলীয় লেজুড়বৃত্তি, পদ-পদবি, টাকার হিসাব যুক্ত হলে এ ধরনের বিচ্যুতি আসে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের ভেতর। '৯০-এর দশকে এ ধরনের অপরাধ করে পার পাওয়া গেলেও এখন সম্ভব নয়। নয়া প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ মুহূর্তের মধ্যে সব জানতে পারছে। সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় নির্ণয় করতে পারছে। ছাত্ররাজনীতির এই পরিণতির জন্য রাজনৈতিক দলগুলোই দায়ী। দলগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইঙ্গিতেই অস্থিরতা তৈরি হয়। আমরা ডাকসু নির্বাচনেও এ ধরনের অস্থিরতা দেখেছি। প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ডাকসু নির্বাচন। স্বয়ং রাষ্ট্রপতিও এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন থেকে সেশনজট নেই, একধরনের স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছিল। কারা এই অবস্থার ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। কারও হাতে কেউ যাতে আহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথমত, হামলার কারণ চিহ্নিত করে দোষীদের বিচার নিশ্চিত করা দরকার। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জবাবদিহিসহ স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা দরকার। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দরকার, যাতে শিক্ষার্থীদের কেউ দানবে পরিণত না হয়। আর এই সবকিছু নিশ্চিত করতে বাধ্য করতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মানবিক প্রতিরোধ। আমি সেই আশায় বুক বাঁধতে চাই ফের। মারের ভাষার বিকল রাজনীতির অবসান হোক।

লেখক: অধ্যাপক; চেয়ারপারসন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×