মে দিবস: মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামের প্রতীক
কামরূল আহসান
প্রকাশ: ০১ মে ২০২০ | ০২:১৩ | আপডেট: ০১ মে ২০২০ | ০২:১৪
মহান মে দিবসের ১৩৪তম বার্ষিকী ও আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস এবছর পালন হবে করোনাভাইরাস কভিড-১৯ নামক এক ভীতিকর মহামারি দ্বারা আক্রান্ত অত্যন্ত জটিল ও বিরূপ পরিবেশে। মহান মে দিবস মানুষ কর্তৃক মানুষকে শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের রক্তিম স্মারক। শতাব্দী ব্যাপী শ্রমজীবী মানুষ দিবসটি আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে আসছে সংগ্রামী চেতনায় শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে আমেরিকার শিকাগোর হে’মার্কেট চত্বরে আত্মত্যাগী সংগঠক, নেতা, কর্মী ও শ্রমিকদের। পৃথিবীতে যতদিন শ্রমজীবী মানুষের অস্তিত্ব থাকবে, শ্রেণিশোষণ থাকবে ততদিন দিনটি মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামের প্রতীক হিসেবেই পালিত হবে।
ইতিমধ্যে পৃথিবীর প্রায় ২০২টি দেশের ৩০ লাখের বেশি মানুষ কভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় সোয়া দুই লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতি আরও কতদিন থাকবে তা এখনই বলা মুশকিল।
চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম এই ভাইরাসটির সংক্রমণ ঘটে। চীনা কর্তৃপক্ষ মহামারি সংক্রমণ ঠেকাতে সংগনিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে পুরো এলাকা লকডাউন করে। তারা ব্যাপক হারে মানুষের রোগনির্ণয় পরীক্ষা ও আক্রান্তদের তড়িৎ চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়ে সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর দক্ষতা দেখিয়েছে। লকডাউনে থাকা সকলকে খাদ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে। রোগ প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই এই ব্যবস্থা নেয়ায় জনবহুল দেশটিতে তুলনামূলক কম মানুষের জীবনহানি হয়েছে।
বিশ্বে করোনা ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সংগনিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। তারা সংক্রমণ প্রতিরোধে চীনা গাইড লাইনকে উপযুক্ত মনে করে। ফলে করোনা আক্রান্ত দেশগুলো পর্যায়ক্রমে সংগনিরোধ ও লকডাউন পদ্ধতি গ্রহণ করে।
বিশ্বজুড়ে মানুষকে মহামারি থেকে রক্ষা করতে গৃহীত এই লকডাউন কার্যকর ব্যবস্থা হলেও তা অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সংকট সৃষ্টি এবং নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের কারণে উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রচণ্ড ধস নেমেছে। আর এই উৎপাদন প্রক্রিয়ার মূল শক্তি যে শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ তারাই আজ সব চেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন। কারখানা বন্ধ, লে-অফ, মজুরিকর্তন, ছাঁটাই ঘটনার ফলে শ্রমজীবী মানুষের জীবন দুঃসহ সংকটে পড়েছে। কভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিক কর্মপরিবেশকে স্থবির করে দিয়েছে।
আইএলও'র সাম্প্রতিক সমীক্ষা প্রতিবেদনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে , পরিস্থিতি বিবেচনায় লকডাউনের কারণে বিশ্বে প্রায় ২৭০ লাখ শ্রমিক গভীর সংকটে নিপতিত হবেন, যা বিশ্বের শ্রমশক্তির প্রায় ৮১ শতাংশ। এই সময়ে বেকার মানুষের সংখ্যা হবে দুই কোটি সাতচল্রিশ লাখের মত। চলমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববাণিজ্য ও ভৌগোলিক ব্যবস্থার বিশাল অর্থনৈতিক খাতসমূহ বিপর্যয়কর ক্ষতির সম্মুখীন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, যারা ইতোমধ্যে আর্থিক সচ্ছলতা খুইয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সক্ষমতা হারাবেন। ফলে কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে লে-অফ, ছাঁটাই ও মজুরী কর্তনের কারণে প্রাতিষ্ঠনিকখাতে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী তাদের কাজ ও আয় হারিয়ে সংকটাপন্ন হবেন। অন্যদিকে বিশাল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের দৈনিন্দন জীবিকার উৎস বন্ধ হবে, বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকা অসংগঠিত খাতের শ্রমজীবী মানুষ এক কঠিন ও রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হবেন।
বাংলাদেশও এই করোনাভাইরাস সংক্রমণ কবলিত। ২৫মার্চ থেকে পর্যায়ক্রমে আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এ সময় সংগনিরোধ মেনে ঘরে থাকার ঘোষনণা জারি করা হয়েছে। এমন কঠিন ও জটিল পরিস্থিতিতেও জনজীবন সচল রাখতে নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদন ও সরবরাহ অব্যাহত রেখে যে সকল শ্রমিক মানুষের চাহিদা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের অভিবাদন।
করোনা মহামারি কোভিড-১৯ দেশের ছয় কোটি ৩৫ লাখ শ্রমশক্তির মধ্যে অন্তত সাড়ে পাঁচ কোটি শ্রমজীবী মানুষের জীবনে চরম দুর্দশা বয়ে এনেছে। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকায় তাদের জীবিকার পথ বন্ধ। বিকল্প কোন আয়ের পথও নেই এসব মানুষের। তাদের ঘরের খাবার ফুরিয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে চলছে লে-অফ, ছাঁটাই ও মজুরিকর্তন। অনেক কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের মালিক শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি-বেতন পরিশোধ করছেন না। এতে শ্রমঅধিকার মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। শোভন কাজ, মজুরি ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
করোনার ভয়াবহ দুর্যোগময় পরিস্থিতিতেও গার্মেন্ট কারখানার মালিকরা প্রয়োজন দেখিয়ে লকডাউনের মধ্যে শ্রমিকদের কাজে যোগদান করিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কারখানায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত সামাজিক দূরত্ব বিধি কতটা অনুসরণ করা হয়, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী বা পিপিই কতজন শ্রমিক পেয়েছে, আমরা জানি না।
অসংগঠিত খাতের ব্যাপক শ্রমজীবী মানুষ যারা কভিড-১৯ মহমারির কারণে জীবিকা হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তাদের পরিবারের জীবন বাঁচাতে খাদ্য ও নগদ আর্থিক প্রনোদনা দেয়া এবং তাদের জীবিকার টেকসই সমাধান করা আজ জরুরি এবং ভবিষ্যতের স্বার্থে রাষ্ট্রকেই এই ব্যবস্থা নিতে হবে।
অভিবাসী শ্রমিক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যারা অসামান্য অবদান রেখেছেন, কভিড-১৯ এর আক্রমণে আজ তাদের পেশা ও কাজ হারিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন। করোনা সংকটে প্রবাসে কাজ ও জীবিকা হারিয়ে তারা দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা অগ্রাধিকারে রাখতে হবে।
করোনা মহামারি প্রতিরোধ, মোকাবেলা ও চিকিৎসায় হাজারো চিকিৎসক, নার্স হেল্থ টেকনোলজিষ্ট, স্বাস্থ্যকর্মী, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কর্মী বাহিনী, অ্যাম্বুলেন্স চালক, পরিচ্ছন্ন কর্মী যারা এখন মহামারি প্রতিরোধের সম্মুখ সারির যোদ্ধা; যারা এই দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে ক্লান্তিহীনভাবে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ করতে দিনরাত শ্রম দিচ্ছেন। এ সকল যোদ্ধা অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি ছাড়াই কাজ করছেন এবং ঝুঁকিতে রয়েছেন; এ সকল মহান যোদ্ধাদের প্রতি সশ্রদ্ধ অভিবাদন।
করোনা মহামারি পুঁজিবাদী সংকটকে প্রকটভাবে দৃশ্যমান করেছে। বিশেষ করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় জনস্বাস্থ্যনীতির করুণ ও উৎকট চেহারা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। পুঁজিবাদ তার বৈশিষ্টের কারণেই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে মুনাফার ক্ষেত্র বানিয়ে ব্যক্তিখাতের বিকাশ এবং বহুজাতিক কোম্পানির একচেটিয়া কারবারে পরিণত করেছে। ফলে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণ জনগণ সহজলভ্য চিকিৎসা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এবারের মে’ দিবসে বিশ্বের সকল সংগ্রামী শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ করোনা মহামারি পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা থেকে আজ দাবী তুলছে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, চিকিৎসা সহজলভ্য এবং বিনামূল্যে প্রতিষেধক পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবাখাতকে পরিপূর্ণভাবে ব্যক্তি মালিকানামুক্ত করে সর্বজনীন ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনার।
দুর্যোগময় এই পরিবেশ ও সংকটকালে মহান মে দিবসের প্রেরণায় বাংলাদেশের সকল স্তরের শ্রমিক ও মেহনতী জনতা সচেতনার সঙ্গে তাদের শোষণ-বঞ্চনা মুক্তির সংগ্রামে দৃঢ় ও সক্রিয় থাকার শপথ নেবে। বিনামূল্যে শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার, শোভন কাজ, শোভন মজুর , কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা ও পূর্ণকালীন চাকরি পাওয়ার অধিকার এখন সময়ের দাবী।
শ্রমিকশ্রেণি তার অতিত গৌরময় সংগ্রামের ধারা অক্ষুন্ন রেখে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের শোষণের অবসান, শ্রমিকের মুক্তির সংগ্রাম এগিয়ে নেয়া, শ্রমিকের আধুনিক প্রয়োজন নিশ্চিত করা এবং পুঁজিবাদী বর্বরতার বিরুদ্ধে অব্যাহত সংগ্রাম চালিয়ে শোষণের শিকল ভাঙ্গার দৃঢ় প্রত্যয় জানায়। সকল পর্যায়ের শ্রমিক-কর্মচারী, অভিবাসী শ্রমিক, অবসরপ্রাপ্ত, বেকার কর্মহীন মানুষ, নারী-পুরুষ সকলেই এক জটিল ও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি । ঐক্যবদ্ধভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলার সামর্থ্য এদের আছে। সেই সক্ষমতা দিয়ে শ্রেণি শোষণ ও বঞ্চনা রুখে দাঁড়াবার প্রত্যয়ই মহান মে’ দিবসের শিক্ষা। এ লড়াইয়ে 'কেউ একা নন’ এটাই এবারের মে’ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য।
দুনিয়ার মজদুর এক হও!
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন
- বিষয় :
- কামরূল আহসান
- মে দিবস
- মহান মে দিবস