ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

ইতিহাস-ঐতিহ্যের সংগ্রহ ভান্ডার

ইতিহাস-ঐতিহ্যের সংগ্রহ ভান্ডার
×

সাইফুজ্জামান

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

জাদুঘর প্রতিষ্ঠান, যেখানে পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর সংগ্রহ সংরক্ষিত থাকে। জাদুঘরে বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বস্তুগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষিত করা হয় এবং সেগুলো প্রদর্শন আধার বা ডিসপ্লে কেসের মধ্যে রেখে স্থায়ী অথবা অস্থায়ীভাবে জনসাধারণের সমক্ষে প্রদর্শন করা হয়। বিশ্বের অধিকাংশ বড় জাদুঘরই প্রধান প্রধান শহরগুলোতে অবস্থিত। অবশ্য ছোট শহর, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলেও স্থানীয় জাদুঘর গড়ে উঠতে দেখা যায়।
ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে জাদুঘরের ইতিহাস জড়িত। ১৯১৩ সালের ২০ মার্চ ঢাকা জাদুঘর ২ হাজার রুপি তহবিলে যাত্রা শুরু করে। বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি কক্ষে 'ঢাকা জাদুঘর' উদ্বোধন করেন। ১৯১৫ সালের জুলাই মাসে সচিবালয় থেকে নিমতলীর বারোদুয়ারি ও দেওড়িতে 'ঢাকা জাদুঘর' স্থানান্তর করা হয়। নিমতলীতে অবস্থিত ঢাকা জাদুঘর ক্রমেই পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিত্তবান, ইতিহাসমনস্ক ব্যক্তিদের নিরলস পৃষ্ঠপোষকতায় জাদুঘরে সংগ্রহ বাড়তে থাকে। ১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল ঢাকা মিউজিয়াম অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী বোর্ড ট্রাস্টিজ গঠিত হয়। ১৯৮৩ সালের ২০ নভেম্বর জাতীয় জাদুঘর ভবন উদ্বোধন করা হয়। 'ঢাকা জাদুঘর' 'বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে' আত্মীকৃত হয়ে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় উন্নীত হয়। শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর আজ গৌরবের বহুমাত্রিক নিদর্শন প্রদর্শন ও সংরক্ষণের প্রতিষ্ঠান হয়ে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সেতুবন্ধন রচনা করছে।
৮.৬৩ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর শুধু একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা নয়, পরিপূর্ণ সংরক্ষণশালাও বটে। প্রস্তর ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলক, প্রাচীন মধ্যযুগীয় মুদ্রা, শিলালিপি, তুলট কাগজ, তালপাতায় লেখা সংস্কৃত, বাংলা, আরবি ও ফার্সি পাণ্ডুলিপি জাদুঘরের সংগৃহীত নিদর্শনের উল্লেখযোগ্য অংশ। নকশিকাঁথা, কারুশিল্প, সমকালীন শিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্ম, বিশ্ব সভ্যতার উপাদান, গাছপালা, শিলা, খনিজ, প্রাকৃতিক বস্তু জাদুঘরের সংগ্রহে বহুমাত্রিক সমৃদ্ধি ঘটিয়েছে। চারতলা জাদুঘর ভবনের ২০ হাজার বর্গমিটারজুড়ে রকমারি নিদর্শনের প্রদর্শন দৃষ্টিনন্দন। বাংলার ইতিহাসের ধারাবাহিক উপস্থাপন অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত ঘটনাপঞ্জি ইতিহাসের স্মারকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। বীর, যোদ্ধা, ইতিহাসের পাত্রপাত্রী সরব উপস্থাপনায়। বাংলা অঞ্চলের ইতিহাস, বাঙালির আত্মত্যাগে গৌরবদীপ্ত।
আইকম (ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস) ১৯৭৭ থেকে প্রতিবছর একটি বিষয়কে প্রতিপাদ্য করে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালন করে আসছে। এ বছর প্রতিপাদ্য করা হয়েছে- সমতার জন্য জাদুঘর :বৈচিত্র্য ও সম্পৃক্তি। সমাজে বসবাসরত বিভিন্ন শ্রেণি ও মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি সমভাবে জাদুঘরে কীভাবে প্রতিফলিত করা যায়, সে বিষয়টি সামনে এসেছে। জাদুঘর এখন শুধুমাত্র পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের সংগ্রহশালা নয়। সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের রূপান্তর জাদুঘরে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে নিদর্শন সংগ্রহ করার কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে। সমতা বিধানের ক্ষেত্রে বৈষম্য চিহ্নিত প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রহ দিয়ে জাদুঘরের গোড়াপত্তন হয়েছিল। আজ সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমকালীন বস্তুসম্ভার সংযুক্ত হয়েছে জাদুঘরে। পৃথিবীব্যাপী জাদুঘরের কর্মকাণ্ড প্রসারিত হয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাদুঘরকে দর্শকপ্রিয় করার ব্যাপারে জাদুঘর কর্মীদের নিত্যনতুন ভাবতে হচ্ছে। প্রদর্শনের নতুনত্ব ও পর্যাপ্ত তথ্য জাদুঘর ভান্ডারে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর অনুষ্ঠানমালায় নতুনত্ব এনেছে। প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত নিদর্শনের খুঁটিনাটি দিক কম্পিউটার ও ট্যাবে প্রতিনিয়ত আকর্ষণীয়, চলমান ও জীবন্ত করে দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে স্বাধীন বাংলা বেতার কক্ষে শব্দ সৈনিকের অংশগ্রহণ, স্মৃতিচারণ ও স্মৃতিসামগ্রী প্রদর্শন করা হয়েছে। এ ধরনের অসংখ্য বিশেষ প্রদর্শনী জাতীয় জাদুঘরে হয়ে থাকে। নিদর্শন সংগ্রহ চলমান প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। আধুনিক জাদুঘর নিত্যনতুন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বস্তু নিদর্শন উপস্থাপন আকর্ষণীয় ও তথ্যবহুল করার বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসে কামনা, সাধারণ জনগণ ও জাদুঘর কর্মীরা ভবিষ্যতে আধুনিক জাদুঘর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আমাদের জাতীয় জীবনে বিশেষ অবদান রাখবে। বীর ও শহীদের দানে গড়ে ওঠা এ দেশে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উপাদান সংরক্ষণ অতীব জরুরি। বিস্মৃত জাতি সামনে এগিয়ে যেতে জানে না।
উপ-কিপার, জাতীয় জাদুঘর
[email protected]

আরও পড়ুন

×