করোনা ভাবনা
ডা. মাহবুবা আক্তার চৌধুরী
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২০ | ১২:০০
কতদিন মনে মনে ভাবি, নিজের ওপর একটা গল্প লিখি। গল্পে আমি থাকব, তুমি থাকবে, সে থাকবে। লিখতে আলসেমি লাগে, তাই ভাবনা ভাবনাই থেকে যায়। জীবন থেকে পাওয়া আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা, সময়কে কখনও ছাড় দিতে হয় না, কাউকে কখনও ভরসা করতে হয় না, ভবিষ্যতের সুখস্বপ্নে বর্তমানকে বিসর্জন দিতে হয় না এবং সর্বোপরি রক্তের সম্পর্ক ছাড়া অন্য সম্পর্ক কখনও আপন হয় না।
আফসোস, বুঝতে বুঝতে ৪৮টা বছর চলে গেল। নতুন করে শুরু করার অপশন নাই। জীবন হচ্ছে বুলেটের মতো, বেরিয়ে গেল তো গেলই।
আচ্ছা, একবারই যেহেতু দিয়েছেন, গড়পড়তা ৭০ বছরই যেহেতু দিয়েছেন, আল্লাহ তো আরেকটু ধীরে ধীরে সময়টাকে পার করতে পারতেন। ১২ মাসে বছর না হয়ে ৪৮ মাসে বছর হতে পারত, আমরা ধীরে ধীরে বুঝেশুনে বড়ো হতে পারতাম, আস্তে ধীরে বুড়ো হতে পারতাম।
জন্ম নিতে নিতেই হাঁটাহাঁটি শুরু, হাঁটতে না হাঁটতেই স্কুলে যাওয়া শুরু, তারপর তো রকেটে চড়ে বসা। আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে জীবনের প্রতিটা পল, প্রতিটা মুহূর্ত ধাবমান। সকালে ঘুম থেকে উঠে নাকেমুখে কিছু গুঁজে দিয়ে স্কুলে দৌড়ানোর চেয়েও দ্রুততায় জীবন পালিয়ে গেল।
রূপ রস গন্ধ... কিছুই আস্বাদন করতে পারলাম না। না ঠিকমতো দেখতে পেলাম, না ভোগ করতে পেলাম, তার আগেই বার্ধক্য ঠক ঠক ঠক... কড়া নাড়তে শুরু করল। কত হাহাকার বুকের কোণে শ্বাস ফেলে যায়, কত অশ্রুবিন্দু চোখের কোণে ঠাঁই করে নেয়, বয়স ছাড় দেয় না কানাকড়িও। হাত ধরে নিয়ে চলে কবরের দিকে। বুড়োও তো হতে পারলাম না ঠিকমতো!
অসুখ-বিসুখ জাঁকিয়ে বসতে পারল না এইবেলা, তার আগেই কোথাকার কোন চীন দেশ থেকে মহামারি এসে হাজির, প্রতিমুহূর্তে চোখ রাঙাচ্ছে! চোখ সরিয়ে নিব সেই উপায়ও নেই, দশ দিগন্ত গ্রাস করে নিয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে যেন। ঠারে ঠুরে জানান দিচ্ছে এই এলাম বলে!
কাঁহাতক নিজেকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াব, কোথায় নিজেকে লুকাব বুঝে পাই না। কড়া নাড়ে কে? ওই বুঝি এলো! হায়, একটু সময় কি দেওয়া যায়?
আলমারির তাকে থরে থরে সাজানো আমার কয়েকটা শাড়ি এখনও ভাঁজ ভাঙা হয়নি, হ্যাঙ্গারে ঝুলানো কয়েকটা জামা এখনও গায়ে তুলিনি, গেলবার কলকাতা থেকে আনা ফ্যাশনেবল জুতাগুলো, নন্দন থেকে কেনা অ্যান্টিক গয়নাগুলো, জাপান থেকে আনা কসমেটিকসগুলো, ফ্রান্স থেকে আনা সুগন্ধিগুলো, বই আর ফেসবুকের দেয়াল থেকে পাওয়া কল্পনাগুলো, দু'চোখে জমিয়ে রাখা স্বপ্নগুলো।
কত কি জমে আছে আমার ক্ষুদ্র জীবনের ফ্রেমে, হে করুণাময় কিছুটা সময় কি আমাকে দেওয়া যায়, কিছুটা আয়ু?
আমার যে জীবনের কতকিছু পাওয়া বাকি, একটু সুখ, একটু বিশ্বাস, একটু ভালোবাসা। বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে ভালোবাসার মানুষটার সঙ্গে এক কাপ চা খাওয়া, মেয়ের হাত ধরে সবুজ ঘাসের গালিচায় ছোটাছুটি করা, দোলনচাঁপার ঘ্রাণে পাগল হওয়া, ঝুম বৃষ্টিতে মনের সুখে কাকভেজা হওয়া, কুয়াশার জোছনায় বাঁশির সুরে হারিয়ে যাওয়া।
তীব্র গরমে দোজখ দোজখ বলে অতিষ্ঠ হতে হতে আল্পসের চূড়ার মাইনাস ৪০ ডিগ্রির শীতল স্মৃতি রোমন্থন করা, বৃষ্টির মতো ঝরেপড়া কুয়াশায় কাঁপতে কাঁপতে মালদ্বীপের বিরক্তিকর ট্রপিকাল আবহাওয়ার তপ্তদিন মনে করা।
সাবমেরিন ডাইভ দেবো বলে গিয়েছিলাম, সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল, সমুদ্রের উত্তাল স্রোত বাদ সাধল। শয়তানি! একজীবনের সব সাধ পূরণ হতে দেবে না। সব কোথায়! কিছুই তো পূরণ হলো না!
হে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর, আরও কিছু দিন কি আমার ঝুলিতে ভরে দেওয়া যায়? আরও কিছু মুহূর্ত? এক জীবনে যে আমার কত কিছুই পাওয়া বাকি, একজনমে যে আমার সবই কেবল হাহাকার, আরেকটা জনম কি দেওয়া যায় না? মৃত্যুর আগে আরেকটা নতুন সূচনা?
- বিষয় :
- করোনা ভাবনা
- ডা. মাহবুবা আক্তার চৌধুরী