কালের আয়নায়
গরিবের গুড় যেন ধনী পিঁপড়েয় না খায়
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২০ | ১২:০০
মার্কিন বর্ডার প্যাট্রলের এক সৈন্য গুয়াতেমালার এক কিশোরীকে মাথায় গুলি চালিয়ে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করেছে। ২০ বছরের এই কিশোরীর নাম ক্লডিয়া প্যাট্রিসিয়া গোমেজ। রক্তপিপাসু এক মার্কিন সৈন্যের এক গুলির আঘাতেই একটি কুড়ি বছরের কিশোরীর স্বপ্ন, আশা, ভবিষ্যতের সব রঙিন ছবি চিরতরে মাটির ধুলায় মিশে গেছে। সভ্য মার্কিন মুল্লুকের এক সৈন্য এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন। এই বর্বরতার নিন্দা জানাব কোন ভাষায়?
ক্লডিয়ার অপরাধ কী ছিল? সে গুয়াতেমালার এক গরিব ঘরের মেয়ে। অনেক অভাব-অনটনের মধ্যে অ্যাকাউন্টেন্সিতে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর আরও উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য আমেরিকায় যেতে চেয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে যাওয়ার অনুমতি না পেয়ে বিনা অনুমতিতে তার স্বপ্নের দেশের সীমান্তে যেতে চেয়েছিল। টেকসাসের রিওব্রাভো শহরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
একটি সম্ভাবনাময় জীবনকে এমনভাবে শেষ করে দেওয়ার অধিকার কি মার্কিন বর্ডার পাহারা দেওয়ার পুলিশ অথবা সৈন্যদের আছে? ট্রাম্প সাহেব কি তাদের সেই অধিকার দিয়েছেন? বিশ্বের কোন দেশের ইমিগ্রেশন আইনে আছে অবৈধ ইমিগ্রান্টদের এভাবে গুলি করে মারা যাবে? আইনে বলে, অবৈধ বহিরাগতদের আটক করা যাবে, ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো যাবে। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় ২০ বছরের এক শিক্ষার্থী কিশোরীকে মাথায় গুলি মেরে পশুর মতো হত্যা করার অধিকার কোন দেশের ইমিগ্রেশন আইনে আছে?
ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার অনিয়ম, অনাচার ও মিথ্যাচারে দেশটি ইতোমধ্যেই বিশ্বের নৈতিক নেতৃত্ব হারিয়েছে। মেক্সিকান সীমান্তে দেয়াল তৈরি এবং মেক্সিকান বহিরাগতদের সঙ্গে অমানুষিক আচরণ চালানোর নীতি অনুসরণ করায় তিনি বিশ্বময় নিন্দিত হয়েছেন। নাৎসি জার্মানির হিটলার ইহুদিদের সঙ্গে যে আচরণ করেছিলেন, যেভাবে মায়ের বুক থেকে তার শিশুকে ছিনিয়ে তাদের আলাদা রাখতেন, মেক্সিকান বর্ডারে সেই একই নীতি গ্রহণ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মায়ের বুক থেকে শিশুদের ছিনিয়ে নিয়ে তিনি অস্বাস্থ্যকর ডিটেনশন কেন্দ্রে শিশুদের রেখেছিলেন।
ফলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আমেরিকাতেও বিক্ষোভ দেখা দেয় এবং ট্রাম্প এই ইমিগ্রেশন নীতি বদলাতে বাধ্য হন। তা সত্ত্বেও তার বহিরাগত বিদ্বেষ এবং বহিরাগতদের নির্যাতনের সাধারণ নীতি কিছুমাত্র বদলায়নি। বিস্ময়ের কথা হলো, মাত্র ক'দিন আগে কালো জর্জ ফ্লয়েডকে ট্রাম্পের এক সাদা পুলিশ নির্মমভাবে হত্যা করায় আমেরিকা যখন গণবিক্ষোভে উত্তাল, তখন মার্কিন বর্ডার সৈন্য এক বহিরাগত কিশোরীকে নির্মমভাবে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। মেয়েটির শোকার্ত পিতামাতা বলেছেন, মার্কিন সৈন্য বহিরাগত বিশেষ করে অশ্বেতাঙ্গ বহিরাগতদের জানোয়ার মনে করে এবং তাদের সঙ্গে সে রকম ব্যবহার করে।
অথচ এই আমেরিকা অন্য দেশের ব্যাপারে 'মরাল গার্ডিয়ান' বা নৈতিক অভিভাবকের ভূমিকা গ্রহণ করে। বাংলাদেশ, ভারতের মতো দেশগুলোতে পান থেকে চুন খসলেই আমেরিকা তাদের উপদেশ দিতে শুরু করে। বাংলাদেশের মতো দেশে নারী নির্যাতন ও সাম্প্রদায়িক অশান্তির মতো বিচ্ছিন্ন দু-একটা ঘটনা ঘটলেই আমেরিকা 'অভিভাবকে'র ভূমিকা গ্রহণ করে দেশটিকে ধমক দেয়, তোমাদের দেশে মানবিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। কিংবা নারী নির্যাতন বেড়েছে। কিন্তু ওই ইতস্তত বিচ্ছিন্ন ঘটনার চাইতে অশ্বেতাঙ্গ নারী-পুরুষের ওপর যে অমানবিক অত্যাচার চলে মার্কিন মুল্লুকে এবং বহিরাগতদের যেভাবে পশুর মতো ট্রিটমেন্ট করা হয় তাতে মার্কিন হোয়াইট এস্টাবলিসমেন্ট আদৌ লজ্জিত নয়। এই সত্যটি গুয়াতেমালার কিশোরী ছাত্রী ক্লডিয়া প্যাট্রিসিয়া গোমেজ নিজের বুকের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন।
বর্ডার পুলিশ ও সৈন্য সব দেশেই আছে। তাদের আচরণ কী ধরনের হবে, তা সাধারণত নির্ভর করে দেশগুলোর সরকারের নীতি ও আচরণের ওপর। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উভয় দেশের বর্ডার রক্ষীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং রক্তপাত নতুন নয়। সীমান্তে প্রায়শই ভারতীয় বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নিহত হয়। ভারত সরকার এই নিহত মানুষগুলোকে ঢালাওভাবে গরুচোর, চোরাচালানি ও অবৈধ মাদক ব্যবসায়ী আখ্যা দিয়ে থাকে। একবার ফেলানী নামে এক বাংলাদেশি কিশোরীকে হত্যা করে ইলেকট্রিক পোলের মাথায় ঝুলিয়ে রাখায় দু'দেশের সম্পর্ক তিক্ত হতে চলেছিল। ভারতীয় সৈন্যটির বিরুদ্ধে এ জন্য ভারত সরকার হত্যাকাণ্ডের মামলা দায়ের করেছিল।

হাসিনা সরকারের আমলেই একবার বর্ডারে একদল ভারতীয় সৈন্য সীমান্ত বিরোধের জের ধরে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকে পড়ে। তৎকালীন বিডিআর ও স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৬ জন বিএসএফ নিহত হয়। তখন বিজেপির অটল বিহারি বাজপেয়ি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এই ঘটনায় দু'দেশের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়।
এই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখান। তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির কাছে টেলিফোন করেন এবং সীমান্তের ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দূর হয়। ভারতের সাম্প্র্রদায়িক শক্তি এই ঘটনাটি নিয়ে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করেছিল, তা ব্যর্থ হয়ে যায়।
পরে তদন্ত চলাকালে জানা যায়, তখন বিডিআরের প্রধান ছিলেন বিএনপিপন্থি। তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অশান্তি ঘটাতে চেয়েছিলেন। শেখ হাসিনা তার দূরদর্শিতার দ্বারা শুধু এই চক্রান্ত ব্যর্থ করেননি, বিজেপি ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে অনেক দুরূহ বিবাদের অবসান ঘটিয়েছেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক ও সহযোগিতা নিশ্চিত করেছেন।
বর্তমানে কভিড-১৯ তথা করোনাভাইরাসে সারাবিশ্ব আক্রান্ত। মানবতার এই মহাবিপদের দিনে গোটা মানবজাতির যেখানে ঐক্যবদ্ধ হয়ে করোনাকে পরাভূত করার জন্য যুদ্ধ করা উচিত, গোটা বিশ্ব যখন এই ঐক্য চাচ্ছে তখনও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা বাধাচ্ছেন, নিজ দেশে বর্ণ, নির্যাতন ঘটাচ্ছেন, যারা বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে নেমেছেন, তাদের টেররিস্ট আখ্যা দিচ্ছেন। এ জন্যই অনেক সংস্কারমুক্ত মানুষও বলছেন, ট্রাম্পের পাপ এবং অপরাধেই করোনার মতো সর্বগ্রাসী বিপদ নেমে এসেছে বিশ্ববাসীর মাথায় এবং সবচাইতে বেশি মানুষ করোনার বলি হচ্ছে আমেরিকায়।
সেই প্রাচীনকালের উপকথার রাজা ইডিপাসের মতো। ইডিপাস ছিলেন প্রজাহিতৈষী। কিন্তু তার রাজ্যে দুর্ভিক্ষ, ঝড়, বন্যা, মহামারি লেগেই ছিল। ইডিপাস তার রাজ্যের পণ্ডিতদের ডাকালেন এর কারণ নির্ণয় করার জন্য। পণ্ডিতরা গণনায় বসে যা জানতে পারলেন তা বিস্ময়কর। ইডিপাস না জেনে এমন এক অপরাধ করে চলেছেন, যার জন্য তার রাজ্যে প্রকৃতির এই অভিশাপ। বর্তমানেও কেউ যদি দাবি করেন, ট্রাম্পের মতো গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের লোভী এবং মনুষ্যত্ববোধহীন নায়কদের পাপ এবং অপরাধেই বিশ্বজুড়ে প্রকৃতির এই রূদ্ররোষ, তাকে অযৌক্তিক বলা যাবে কি?
যারা মধ্যপ্রাচ্যে বছরের পর বছর যুদ্ধ বাধিয়ে রেখে, মারণাস্ত্র ব্যবহার করে জীবাণুযুদ্ধ চালাতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ নিরীহ নরনারী হত্যা করছে; যুদ্ধ বাধিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে গৃহহীন শরণার্থী বানিয়ে তারপর তাদের সমুদ্রে ডুবিয়ে মারছে; তারপর এখন নিজ দেশে জর্জ ফ্লয়েডের মতো নিরীহ কালো মানুষ, ক্লডিয়া প্যাট্রিসিয়া গোমেজের মতো এক বিদ্যার্থী কিশোরীকে নির্মমভাবে হত্যা করছে, প্রকৃতি কি নীরবে তা সহ্য করবে? ধরিত্রীকে বলা হয় সর্বসহা। ধরিত্রী কি সত্যই তাই? তাহলে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত মহাদেশে কেন বিনা কারণে অরণ্যে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। শয়ে শয়ে মানুষ গৃহহীন আশ্রয়হীন হয়? ব্রিটেন, ওয়েলসের মতো ইউরোপীয় দেশ কেন বাংলাদেশের মতো ভয়াবহ প্লাবনে প্রতি বছর শহরাঞ্চলও জলমগ্ন হয়। প্রতি বছর বিষাক্ত রোগজীবাণু ছড়ায়। ভূমিকম্প হয়? হাজার হাজার মানুষ মরে?
এসকল প্রশ্নের কোনো বিজ্ঞানসম্মত জবাব নেই, তা নয়। হিংসায় এবং লোভে আমরা এতই উন্মত্ত যে, সেই জবাবের দিকে তাকাবার ইচ্ছা এবং আগ্রহ আমাদের নেই। বাংলাদেশ এখন করোনার মহাগ্রাসে। কিন্তু তার মধ্যেও চলছে 'করোনা-বাণিজ্য ও দুর্নীতি'। করোনা থেকে বাঁচার জন্য যে মাস্ক, দস্তানা এবং অন্যান্য উপকরণ দরকার তা সরকারকে সরবরাহ করার কন্ট্রাক্ট পেয়েছেন এক মন্ত্রীপুত্র। তিনি এক টাকা দামের জিনিস পাঁচ টাকায় এবং পাঁচ টাকার জিনিস পনেরো টাকায় সরকারকে সরবরাহ করেন। মন্ত্রী জেনেও উদাসীন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সতর্কদৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ঢাকা থেকে অনেকেই আমাকে অভিযোগ জানাচ্ছেন। বিষয়টি তদন্ত হওয়া এবং তদন্তে তা সত্য প্রমাণিত হলে দুদকের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
জুন মাসের প্রারম্ভেই বাংলাদেশে যে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তাকে আখ্যা দিয়েছেন 'মানুষ বাঁচানোর বাজেট'। আমার মুহিত ভাই আবুল মাল আবদুল মুহিত যখন অর্থমন্ত্রী হয়ে প্রথম বাজেট পেশ করেছিলেন, তার নাম দিয়েছিলেন গরিবের বাজেট। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গিয়েছিল গরিবদের মারা যাদের ব্যবসা, তারাই বাজেটের নানা ফাঁকফোকরে উপকৃত হচ্ছে। এবারের মানুষ বাঁচানোর জন্য বাজেটে অনেক প্রোভিশন রাখা হয়েছে। কিন্তু এই প্রোভিশন দ্বারা যেন করোনার গ্রাসে নিপতিত মানুষের সাহায্য হয় সে জন্য সরকারের অন্যান্য দপ্তরের কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। বাজেটে মানুষের জন্য ধার্য 'গুড় যাতে পিঁপড়ে না খায়' সেদিকে লক্ষ্য রাখবে কে? আওয়ামী লীগের এই পিঁপড়ের সংখ্যা এখন সর্বাধিক।
গুয়াতেমালার ২০ বছরের কিশোরী মেয়ে ক্লডিয়ার কথায় আসি। সে চোর নয়, বাটপার নয়। আমেরিকায় আসতে চেয়েছিল উচ্চ শিক্ষার জন্য। তার চোখে ছিল ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন। ট্রাম্পের সৈন্যের বন্দুকের গুলি তার চোখের সেই রঙিন স্বপ্ন চিরতরে ভেঙে দিল। পবিত্র কোরআনে দেড় হাজার বছর আগে অত্যাচারী আবু লাহাব সম্পর্কে বলা হয়েছিল- 'ধ্বংস হোক আবু লাহাবের বাহুদ্বয়' (তাব্বাত ইয়াদা আবু লাহাব...) ট্রাম্প এবং তার সহযোগীদের জন্যও আমার আজ একই প্রার্থনা।
লন্ডন, ১১ জুন, বৃহস্পতিবার, ২০২০
- বিষয় :
- কালের আয়নায়
- আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী