ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

মানব পাচার

রং বদলের বিপজ্জনক খেলা

রং বদলের বিপজ্জনক খেলা
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ জুন ২০২০ | ১৫:৩৯

মানব পাচারের বলি হয়ে আমাদের সম্ভাবনাময় উল্লেখযোগ্য তরুণের নির্মম পরিণতি বেদনাদায়ক। মানব পাচারের বিষয়টি বরাবরই দেশে-বিদেশে আলোচিত হয়ে আসছে; নানা সময়ে এর বিরুদ্ধে সরকার কঠোর হলেও এটি বন্ধ হয়নি। সর্বশেষ লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশির মৃত্যুর পর নতুন করে বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আসে। ইতোমধ্যে লিবিয়ার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানব পাচার ও সন্ত্রাস দমন আইনে সারাদেশে বাইশটি মামলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সতেরো জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এটা স্বস্তির বিষয় যে, পুলিশের এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শনিবার সমকালের প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, ঢাকা থেকে লিবিয়া যাওয়ার পথে কীভাবে চলে 'পাচারে রংবদলের খেলা'। লিবিয়ায় হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্তে মানব পাচারের চাঞ্চল্যকর যে তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাতে আমরা হতবাক।

আমরা দেখেছি, মানব পাচার চক্রের সদস্যদের মধ্যে নারীও রয়েছে। এমনকি এদের শিকড় গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। এ দালাল চক্র ইউরোপে সুন্দর জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করে। তাদের প্রলোভনে বিশ্বাস করে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় অনেকেই তাদের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে। মানব পাচার চক্রের সদস্যরা দেশে দেশে সক্রিয় থেকে পরস্পরের মধ্যে যোগসাজশে এ অপকর্ম সম্পাদন করে। সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনে এসেছে, এ চক্রের ফাঁদে পা দেওয়া তরুণদের নানা রুট দিয়ে ঢাকা থেকে দুবাই পাঠানো হয়। ঢাকা থেকে পাচারকারী চক্র ওই তরুণদের দুবাইয়ে অবস্থানকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। দালালরা বিভিন্ন এয়ারপোর্টে নানা রঙের টি-শার্ট পরিহিত দেখে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের চিনে নেয়। এভাবে দুবাই থেকে জর্ডান এরপর লিবিয়ায় তাদের পৌঁছানো হয়। লিবিয়াতেই তাদের জিম্মি করে টাকা আদায়ের বিপজ্জনক খেলা শুরু হয়।

আমরা জানি, যারা পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পা দেয় তাদের কিংবা তাদের অনেকের পরিবারের অবস্থাই হয়তো সচ্ছল নয়। সচ্ছল ও সুন্দর জীবনের আশায়ই তারা ইউরোপের মতো উন্নত বিশ্বে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। তাদের অনেকের কাছে নগদ টাকা না থাকলেও কেউ ঋণ করে কিংবা কেউ জমিজমাসহ সর্বস্ব বিক্রির টাকা পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। এরপরও যখন তারা ইউরোপের কাছাকাছি লিবিয়ায় গিয়ে পাচারকারীদের হাতে জিম্মি হয়ে পরিবারের কাছে অতিরিক্ত অর্থ চায়, সেটা কতটা অমানবিক। এমনকি সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনে এসেছে, টাকা না পেলে পাচারকারীরা অমানুষিক নির্যাতন চালায়। নির্যাতন করে স্বজনদের তা মোবাইলে ভিডিওকলে দেখানোও হয়। আবার লিবিয়ার ক্যাম্প থেকে স্থানীয় মাফিয়াদের পক্ষ থেকে উদ্ধারের নামে স্বজনদের কাছে টাকা চাওয়া হয়। এভাবে মুক্তিপণ হিসেবে স্বজনদের কাছ থেকে যে অর্থ আদায় করা হয়, তাতে মানব পাচারকারীদের নিষ্ঠুরতাই আমরা দেখছি।

এরপরও অনেকেই কাঙ্ক্ষিত দেশে যেতে পারে না। লিবিয়া থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে ইউরোপের দেশ ইতালি যেতে ভূমধ্যসাগরে এমন চাকরিসন্ধানীদের সলিল সমাধির খবর আমরা দেখেছি। মানব পাচারে এমনি নিষ্ঠুর নানা ঘটনা ঘটে। মানব পাচারকারী চক্র টাকার নেশায় মানুষ বিক্রির মতো কাজ করছে। তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক মামলাগুলোর কারণে এবং আটককৃতদের জবানবন্দিতে এমন নির্দয় ও চাঞ্চল্যকর নানা ঘটনা সামনে আসছে। আমরা দেখেছি, ফরিদপুরের মানব পাচারকারী মোশারফ মিঞা ইতালিতে পাচারের উদ্দেশ্যে অর্ধশত তরুণকে ছয় মাস ধরে দুবাইয়ে একটি ক্যাম্পে পাসপোর্ট নিয়ে আটকে রেখেছে। তারা গোপনে সমকালের প্রতিবেদকের কাছে তাদের দুর্দশার কথা জানিয়েছেন।

আমরা মনে করি মানব পাচারের এ অভিশাপ থেকে কর্মক্ষম জনশক্তিকে বাঁচাতে সুদূরপ্রসারী কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। পাচারকারী চক্রের কঠোর শাস্তি যেমন নিশ্চিত করতে হবে তেমনি আমাদের তরুণদেরও সচেতন করতে হবে। তার চেয়েও বেশি জরুরি বেকার সমস্যার সমাধান। প্রতি বছর শ্রমবাজারে অন্তত বিশ লক্ষাধিক তরুণ প্রবেশ করে। অথচ কাজ পাচ্ছে সামান্য অংশই। বেকারত্বের অভিশাপ অনেককেই কুরে খায়। আর পাচারকারী চক্র এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে লোভ দেখিয়ে তাদের একটা অংশকে পাচারের সুযোগ পাচ্ছে। আমরা চাই, সরকারি ও বেসরকারি উভয় উদ্যোগে কর্মসংস্থান বাড়ানো হোক। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে চাকরি খোঁজার মানসিকতার চেয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের জনশক্তি রপ্তানিও জরুরি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অবশ্যই যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে যথাযথ সম্মানী ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই তবে কাউকে দেশের বাইরে পাঠানো উচিত। মানব পাচারের এ বিপজ্জনক খেলা এভাবে চলতে দেওয়া যায় না।

আরও পড়ুন

×