ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

করোনা দুর্যোগ

মানুষের পাশে মানুষ

মানুষের পাশে মানুষ
×

ড. আতিউর রহমান

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২০ | ১৫:২৯

মনে হয় এক অভাবনীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই পড়ে গিয়েছি আমরা। আগের বিশ্বযুদ্ধ এভাবে পুরো বিশ্বে ঘটেনি। এবারের শত্রু অদৃশ্য। ভয়ঙ্কর। জীবন ও জীবিকা দুইই আক্রান্ত। সমাজ ও অর্থনীতি স্তম্ভিত। বাংলাদেশ বিগত বিশ্বমন্দা কাটিয়ে তর তর করে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করেই তার গত কয়েক দশকের অর্জন এখন ভূলুণ্ঠিত। প্রবৃদ্ধি কমছে এবং দারিদ্র্য বাড়ছে। সামাজিক পিরামিডের নিচের তলার মানুষগুলোর রোজগারের সুযোগ নেই বললেই চলে। অনানুষ্ঠানিক খাতের সদা পরিশ্রমী মানুষগুলোও আজ ঘরবন্দি। একই সঙ্গে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের একাংশের জীবন ও জীবিকাও হুমকিতে। সরকার অবশ্য চেষ্টা করে চলেছে। বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য খাতকে দাঁড় করাতে চাইছে। কৃষির ওপর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ত্রাণ ও নগদ সহায়তাসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো সক্রিয় রেখেছে। কৃষক, ক্ষুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তা ও গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছে। তা সত্ত্বেও সমাজের নানা স্তরের নানাজন অভাব-অনটনে প্রায় দিশেহারা হয়ে গেছে। যারা গান শেখাতেন, তবলা বাজাতেন, বাঁশি বাজাতেন, বাউল গান গাইতেন তাদেরও রোজগার নেই বললেই চলে। এরা ত্রাণের তালিকায় নেই। নিজেরাও জীবিকার সন্ধান করে নিতে পারছেন না।

সাধারণত সমাজই এগিয়ে আসে সংকটে পড়া এসব মানুষকে বাঁচানোর জন্য। এবারেও ব্যত্যয় ঘটেনি। মানুষ সাধ্যমতো হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন বিপর্যস্ত মানুষের জন্য। তবুও পরিবেশ পরিস্থিতি এতটাই অনিশ্চিত যে, হঠাৎ বিপদে পড়া এ মানুষগুলোর অসহায়ত্বের মাত্রা গভীর। আর এখানেই সমাজের দায় বেশি। সমাজের দুর্দিনে সংস্কৃতি তাকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করে থাকে। তাই সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলোর দুর্দিনে সামাজিক সংগঠনগুলোর তাদের পাশে দাঁড়ানোর কথা। আমরা বাংলাদেশে মানবসৃষ্ট কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সমাজকে অনেকটাই সক্রিয় হতে দেখেছি। এ দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়, বন্যা বা ঝড়ের সময় দেখেছি কীভাবে জেগে ওঠেন সমাজ সচেতন মানুষরা। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আম্পান ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সমাজ হাতে হাত রেখে কাজ করেছে। একাত্তরে পুরো অসহযোগ আন্দোলনের সময় এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দেখেছি সংস্কৃতিজনরা কি গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের মুক্তির গান গেয়েছেন। তাদের পাশে থেকেছেন। তারও আগে সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের লাখ লাখ মানুষের প্রাণ গেল। ঘর নেই। খাবার নেই। প্রয়াত ওয়াহিদুল হকের নেতৃত্বে আমাদের সংস্কৃতিজনদের উজ্জ্বল প্রতিনিধিরা দিনের পর দিন দুঃখী মানুষের পাশে থেকে তাদের মনে ভরসা জুগিয়েছেন। তাদের ব্যথায় ভরা হৃদয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন। ঠিক যেমন অভয় বাণী শুনিয়েছেন অসহযোগ ও মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে।

মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানোর সেই ঐতিহ্যের ধারাকে বয়ে বেড়াচ্ছে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ। এটি সংস্কৃতিমনা মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে পরিচালিত দেশের একটি সংস্কৃতি ও কৃষ্টিচর্চার সুপরিচিত মঞ্চ। সংস্কৃতিজন সন্‌জীদা খাতুন এর সভাপতি। প্রয়াত ওয়াহিদুল হকের হাতের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ হয়েছে এই সংগঠনটি। প্রয়াত অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীও ছিলেন এর নির্বাহী সভাপতি। ডা. সারোয়ার আলী, মফিদুল হক, মিতা হক, আবুল হাসনাত, পাপিয়া সারওয়ার, বুলবুল ইসলামসহ অনেক সংস্কৃতিসেবীই এর সঙ্গে যুক্ত। সন্‌জীদা আপার গভীর আগ্রহে আমি সংগঠনটির নির্বাহী সভাপতি হিসেবে তরুণ সংগঠকদের উৎসাহ দিয়ে থাকি। কাজ তরুণরাই করেন। বুলবুল, লিসা, সোহরাব, তানিয়া, তূর্য, আমীন এবং আলোময়সহ আরও অনেকেই কি গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতাসহ এই সংগঠনটি পরিচালনা করে থাকে তা বলে বোঝাতে পারব না। আমাদের শাখাগুলোও পরিচালনা করেন স্থানীয় গুণী শিল্পী ও সংস্কৃতিজন। আর আমাদের মাথার ওপরে বটবৃক্ষের মতো আছেন সন্‌জীদা আপা।

মার্চ মাসের ৬, ৭ ও ৮ তারিখ সিরাজগঞ্জে জাতীয় সম্মেলন শেষ করে ঢাকায় ফিরেই মুখোমুখি হলাম করোনা সংকটের। প্রতিদিন আমাদের শাখাগুলো থেকে খবর আসতে শুরু করল প্রান্তিক শিল্পীদের দুর্ভোগের। তাদের আয়-রোজগার হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। তারা কারও কাছে হাত পাততেও কুণ্ঠাবোধ করেন। এমনই বিপর্যস্ত সময়ে আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেই। বাঙালির সংস্কৃতি সম্পদের রক্ষক এই শিল্পী সমাজকে এই দঃসময়ে সামান্য সহযোগিতা দিতে পারলেও আমাদের সামাজিক দায় খানিকটা পূরণ হবে এই আশায়। একটি ত্রাণ কমিটি গঠন করলাম। ৬৩টি শাখা হতে পরিবারের সদস্য, বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করে একটি 'কম্পিউটারাইজড' তালিকা তৈরি হলো। গুণিজনসহ ১৯ ধরনের প্রায় বারোশ' বিপন্ন শিল্পী পরিবারকে তিন ধাপে এরই মধ্যে নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। চরাঞ্চলের কিছু বিপন্ন শিল্পীও নগদ সহায়তা পেয়েছেন। তিন ধাপে সব মিলে প্রায় সাড়ে একুশ লাখ টাকা আমরা এরই মধ্যে শিল্পীদের হাতে পৌঁছে দিতে পেরেছি। এ ছাড়া বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনকে এক লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে দুস্থ মানুষের মাঝে খাবার বিতরণের জন্য। এখন আমরা আমাদের সংগঠনে সক্রিয় সংস্কৃতিজনদের পাশে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রচণ্ড অর্থকষ্টে আছেন এমন সদস্যদের উপযুক্ত তালিকা প্রণয়নের কাজ ভালোভাবেই এগোচ্ছে।

শুরুতে আমরা আমাদের সদস্যদের কাছে আহ্বান করি স্বেচ্ছায় অর্থ প্রদানের জন্য। এতে যথেষ্ট সাড়া মেলে। তাছাড়া কেন্দ্র আরও অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যে দেশ-বিদেশে পরিচিতজন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি দারুণ উৎসাহ নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এ পর্যন্ত আমরা ব্যক্তিগত অনুদান পেয়েছি ৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এখনও অনেকেই তাদের সাধ্যমতো অনুদান দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে প্রবাসী শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুদান আমাদের দারুণ অনুপ্রাণিত করেছে। লন্ডনে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করে অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, আইপিডিসি, আইডিএলসি, ব্যাংক এশিয়া, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আব্দুল মতিন চৌধুরী, ছায়ানট এবং আনন্দধারা (ইউকে)। এসব প্রতিষ্ঠান মিলে অনুদান দিয়েছে ২২ লাখ ৪ হাজার ৪৭৮ টাকা। এর বাইরে এইচএসবিসি রেডক্রিসেন্টের মাধ্যমে প্রায় ৭ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে।

এতটা সাড়া পাব তা আশা করিনি। উল্লিখিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কি বলে ধন্যবাদ জানাব তা বুঝে উঠতে পারছি না। দীর্ঘদিন এদের সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। বিপন্ন শিল্পীদের সহায়তার জন্য এক ডাকে যেভাবে তারা এগিয়ে এসেছেন, তা মানবিক তৎপরতার এক নয়া মাত্রা যোগ করেছে।

এই দুর্যোগ কতদিন চলবে তা জানি না। মানুষের বিপন্নতা বাড়বে বই কমবে না। তাই তাদের মতো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ও পর্ষদের চেয়ারম্যানদের বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ অনেকটাই রয়ে গেছে। দুর্যোগ মোকাবিলা ও মানবিক বিপর্যয় প্রতিরোধে আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বহুবার উদারহস্তে দাঁড়াতে দেখেছি। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির সময় কি বিপুলভাবেই না তারা সাড়া দিয়েছিলেন। এমনকি নেপালের ভূমিকম্পের পর বিপন্ন মানুষগুলোর পাশেও তারা দাঁড়িয়েছেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক মহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে আট কোটি টাকার ত্রাণ ও নগদ সহায়তা নিয়ে তারা কাঠমাণ্ডু পৌঁছে গিয়েছিলেন। নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কৈরালা কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমাকে চিঠি দিয়েছিলেন। প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগেও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তাদের রয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি ছাড়াও কত বিপন্ন শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিজনকে তারা যে সহায়তা করেছে সে হিসাব নাই বা দিলাম। শুধু এটুকু বলতে চাই, যমুনা ব্যাংক ফাউন্ডেশন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীকে আমৃত্যু প্রতি মাসে অনুদান দিয়েছে। সাউথইস্ট ব্যাংক আমাদের অতি প্রিয় কবির নাতনিদের লেখাপড়ার খরচ বহন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও একটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক দায়বদ্ধ তহবিল পরিচালনা করে। তাই সামাজিক দায়বোধ থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এভাবে এগিয়ে আসাটা তাদের ঐতিহ্যেরই অংশ বলে আমার ধারণা।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের সমাজের সম্পদশালী উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অর্থ প্রদান ছাড়াও নানা পর্যায়ের বিপন্ন মানুষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার নানা মানবিক কাজে যুক্ত রয়েছেন। মোবাইলে আর্থিক সেবাদানকারী বিকাশ স্বাস্থ্য খাতে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে। আমাদের অর্থ পাঠাতেও তারা দারুণ ক্ষিপ্রতার ও দক্ষতার প্রমাণ রেখেছে। ব্র্যাক ব্যাংকও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। আরও অনেকেই হয়তো এভাবে কাজ করছেন। তবে সম্পদশালীদের এ সংকটে আরও বেশি সক্রিয় দেখতে চাই।

সামাজের ভেতরে যে আত্মশক্তি রয়েছে তাকে জাগ্রত করার এখনই যে শ্রেষ্ঠ সময়। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন, 'আমাদের বাঁচিবার উপায় আমাদের নিজের শক্তিকে সর্বতোভাবে জাগ্রত করা।' আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সমাজের মনটাকে সমাজের মধ্যে নিবিষ্ট করার উত্তম সময় এই করোনাকাল। সমাজ আরও মানবিক হলে এ সংকট মোকাবিলা করা সহজতর হবে। শুধু অর্থ নয়, বিপন্ন মানুষের মনে ভরসা দেওয়াটাই এই সময়ে সবচেয়ে বড় কাজ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় 'আমরা দুখের বক্রমুখের/চক্র দেখে ভয় না করি/...হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে/করি মোরা পরিহাস।'- এই হোক আজকের প্রতিজ্ঞা।

উল্লেখ্য, কাদের আমরা সহায়তা করলাম তা কিন্তু প্রকাশ করিনি। কেননা আমরা 'হিতৈষতার' নামে তাদের অপমান করতে চাইনি। বরং রবীন্দ্রভাবনার আলোকে প্রীতির দানে তাদের হিত করতে চেয়েছি। অভুক্ত শিল্পী পরিবারে যখন আমাদের এই সামান্য আর্থিক সহায়তা পৌঁছেছে তখন তারা যে কি খুশি হয়েছেন সে প্রতিক্রিয়া আমাদের লিখে জানিয়েছেন অনেকেই। নামোল্লেখ না করেই তাদের একজন লিখেছেন- 'তিন দিন প্রায় অভুক্ত পরিবার নিয়ে। গতকাল ছেলেটা আসার সময় বল্লো, আব্বা চালডাল না নিয়ে এসো না। হাতে টাকা নাই, চাল কিনতে পারিনি বলে, বাড়িতে যাইনি। সাঁইজির ধামে হতভম্ভের মতো বসে আছি। টাকা পেয়ে ছেলেটাকে মনে পড়ে গেলো। চালডাল নিয়ে বাড়ি ছুটবো এখন। আমার বাজান আর বৌ খুব খুশি হবে। কয়দিন না খেয়ে আছে ওরা।' এদের পাশে থাকতে পেরে আমরা ধন্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
[email protected]


আরও পড়ুন

×