উন নজরদারি দুনো অপরাধ
সিন্থিয়া ডি রিচি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২০ | ১৫:২৯
দেশে করোনা পরিস্থিতিতে যে অপরাধ ও সহিংসতা বেড়েছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বস্তুত গোটা বিশ্বেই দেখা গেছে, ঘরবন্দি অবস্থায় বেড়ে গেছে গৃহস্থালি সহিংসতা। সামাজিক দূরত্বের কারণে কেবল অপমৃত্যু নয়, খুন-জখমের হারও বেড়েছে। কিন্তু পুলিশ সদর দপ্তরের একটি পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে বৃহস্পতিবার সমকালে অপরাধ ও সহিংসতার যে চিত্র প্রকাশ হয়েছে, তাতে বিস্মিত হতে হয় বৈকি। ওই প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গত তিন মাসে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৯৬০টি। এর মানে, প্রতিদিন ১০টির বেশি খুন হয়েছে! পারিবারিক সহিংসতাও অবশ্য তিন মাসে ২১শ'র বেশি। সন্দেহ নেই যে আরও অনেক ঘটনা থানা-পুলিশ পর্যন্ত আসে না। কিন্তু দেশে প্রতিদিন ১০টির বেশি খুন হবে- এই পরিসংখ্যান সত্যিই অবিশ্বাস্য। অস্বীকার করা যাবে না যে, খুনের সংখ্যা ও মাত্রাগত বৃদ্ধি মাঝেমধ্যে সংবাদমাধ্যমেও এসেছে। আমাদের মনে আছে, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০ জন খুন হয়েছিল। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা বলেছিলাম- যে কোনো হতাহতই অনাকাঙ্ক্ষিত এবং একটি মৃত্যুও গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু খুনের এই সংখ্যা কেবল সংখ্যাগত দিক থেকেই উদ্বেগজনক।
এসব খুনের কারণ ভিন্ন ভিন্ন হলেও অভিন্ন যে দিকটি নির্দেশ করে, তা হচ্ছে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। এই আশঙ্কাও অমূলক হতে পারে না যে, খুন পর্যন্ত না গড়ানো আরও অনেক অপরাধ সংবাদমাধ্যম বা সমাজের চোখ এড়িয়ে গেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, সত্যিই প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। আমরা মনে করি, হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা বা রক্তপাত বেড়েছে নজরদারি কমে যাওয়ায়। প্রশাসন ও পুলিশের বড় অংশ যখন করোনা মোকাবিলা সংক্রান্ত সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিয়োজিত; আদালতও যখন ভার্চুয়াল ব্যবস্থায় সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে; সমাজের নজরদারি ও তদারকি যখন ঘরবন্দি; অপরাধীরা সেই সুযোগটিই গ্রহণ করছে। আমাদের মনে আছে, কিছুদিন আগে সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল খোদ রাজধানীতে ছিনতাইয়ের বাড়বাড়ন্ত। এই পরিস্থিতি আর চলতে দেওয়া যায় না।
দুর্যোগ ও মহামারির ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের যে অপচেষ্টা যুগে যুগে দেশে দেশেই হয়ে এসেছে। বর্তমান অপরাধ চিত্র তা থেকে ভিন্ন নয়। করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্বেও বেড়েছে অপরাধ ও সহিংসতা। কিন্তু সেখানে দেখা যাচ্ছে, নজরদারি ও প্রতিকারের ঘাটতি নেই। আমরা দেখতে চাইব, দেশের নাগরিকরা যে কোনো সহিংস পরিস্থিতি বা নাজুক আইন-শৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষের নজরে আনবে। পুলিশের 'ট্রিপল নাইন' টেলিফোন এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অপরাধ সম্পর্কে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্টৃ্কতিক সংগঠনকেও সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, মহামারি পরিস্থিতিতে পুলিশের একার পক্ষে সব অপরাধ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এও ভুলে যাওয়া চলবে না, অপরাধীরা যদি পার পেয়ে যেতে থাকে, অপরাধ যদি বাড়তে থাকে, সহিংসতা যদি অপ্রতিরোধ্য হয়; তাহলে কেউই ভালো থাকতে পারবে না।
আমরা দেখতে চাই, করোনা পরিস্থিতি সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। গৃহ সহিংসতা আগাম প্রতিরোধ সহজ নয়; কিন্তু সবাইকে যদি প্রতিকারের পথগুলো সম্পর্কে সচেতন করা যায়, তাহলে তা কমে আসবে আশা করা যায়। আর অপরাধ-পরবর্তী কঠোর পদক্ষেপ একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারে। করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তি যখন নাজুক, তখন আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ব্যাপারে শূন্য সহিষ্ণুতার বিকল্প নেই। আগের সম্পাদকীয় ভাষ্যেরই পুনরাবৃত্তি করে বলতে চাই, এজন্য সময়ে এক ফোঁড় দিন। আগামী মাসের পরিসংখ্যানে গত তিন মাসের ছায়া দেখতে চাই না।
- বিষয় :
- উন নজরদারি
- দুনো অপরাধ
- করোনা পরিস্থিতি