অন্যদৃষ্টি
ধনীর অঙ্ক গরিবের ধাঁধা
ছবি: ফাইল
হাসান ইমাম
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২০ | ১৬:৪৫
তাবৎ দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় ধনী বানানোর কী এক তেলেসমাতি বন্দোবস্ত নাকি আছে এ দেশেই। ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল- এই ১০ বছরে দেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৪ দশমিক ৩। ওয়েলথ এক্সের 'আ ডিকেড অব ওয়েলথ' শীর্ষক গবেষণায় এই হার বিশ্বের সর্বোচ্চ। ৫০ লাখ ডলার বা অন্তত ৪০ কোটি রেস্ত যাদের পকেটে ধনীর তকমাটা তাদের।
ধনীর সংখ্যার এই বাড়বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখে অর্থশাস্ত্র। এর সরলসিধা অর্থ অর্থনৈতিক কর্মকা বাড়ছে। কিন্তু এর মধ্যে ছোট্ট একটা 'অনর্থ' থাকাও অস্বাভাবিক নয়। যদি বৈধভাবে ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং তারা যদি ঠিকঠাক ট্যাক্স দেন, বিনিয়োগ করেন তাহলে তো সোনায় সোহাগা। কিন্তু ব্যতিক্রম হওয়ার আশঙ্কারও কিছু কারণ আছে।
দেশে তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ও আঞ্চলিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে অর্থনৈতিক প্রসার ঘটার বাস্তব কারণ আছে সত্যি। এই কথাটি বলেছে ওয়েলথ এক্সও। কিন্তু এ কথাও সর্বৈব সত্যি, বর্তমানে দেশের ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ গরিব। আর অতি গরিবের সংখ্যা আরও প্রায় ২ কোটি। করোনা অতিমারির ধাক্কায় এই গরিবির পারদ কতটা চড়বে, তা বলার চূড়ান্ত সময় আসেনি; কিন্তু বেসামাল পরিস্থিতিতে ঠেকার আশঙ্কা আছে।
অর্থাৎ একদিকে ধনাঢ্য ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে জেঁকে বসে আছে গরিবিও। এই বিপরীতমুখী অবস্থার সরল সারমর্ম- আয়বৈষম্য। ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত করা খানা আয়-ব্যয় জরিপও বলছে, দেশে আয়বৈষম্য ঊর্ধ্বগামী।
বিশ্বব্যাংকও জানিয়ে দিয়েছে, গত দেড় দশকে দারিদ্র্য কমানোর প্রতিযোগিতায় শীর্ষ ১৫ দেশের তালিকায় নাম লেখাতে পারেনি বাংলাদেশ। অথচ এই সময়কালে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়- দুটোই বেড়েছে। অর্থাৎ এ দুই চিত্র পরস্পরবিরোধী। ভিন্ন এক জরিপে চোখ বুলালে ভিন্ন চিন্তার ভাঁজ আরও প্রশস্ত হয় কপালে। দেশে গত ৬ বছরে জিডিপি বৃদ্ধির দিনগুলোয় সবচেয়ে ধনী ৫ ভাগ মানুষের আয় বেড়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে গরিবির তলানিতে থাকা ৫ ভাগ মানুষের আয় আরও কমেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের সর্বশেষ হিসাবে দেশের ৩৮ শতাংশ সম্পদের মালিকানা মাত্র ১০ ভাগ মানুষের হাতে। আর সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষ মাত্র ১ শতাংশ সম্পদের মালিক।
গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭ হাজার কোটি ডলার বা ৫ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির দেওয়া এই অঙ্ক আগামী অর্থবছরের রেকর্ড বাজেটের চেয়েও বড়। সংস্থাটির হিসাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নামে বছরে পাচার হচ্ছে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। সম্প্রতি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাড বলেছে, বাংলাদেশে বছরে যত কর আদায় হয়, তার ৩৬ শতাংশের সমান টাকা পাচার হয়।
আঙ্কটাডের কাছাকাছি হিসাব দিয়েছে গেল্গাবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটিও (জিএফআই)। গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫৯০ কোটি ডলার বা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য আছে। অর্থমন্ত্রী বাজেটে পাচার ঠেকাতে ৫০ শতাংশ জরিমানা আরোপের প্রস্তাব করেছেন। তার এই প্রস্তাব পাচারের তথ্যের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
এ কথাও সকলেরই জানা, অর্থনীতির আকার অনুপাতে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। খেলাপি ঋণ এরই মধ্যে ১ লাখ কোটি ডলারের ঘর ছাড়িয়ে তড়তড়িয়ে এগিয়ে চলছে।
সুতরাং মাথাপিছু আয়ের হিসাবে বড় একটা গোঁজামিল আছে। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি, দেশের অর্থ-সম্পদ লোপাটকারী, শেয়ারবাজার লুটেরাদের কুক্ষিগত কালো টাকা সমাজের আর-দশজনের গড় সম্পদ বলে দিব্যি চালিয়ে দেওয়া হয় মাথাপিছু আয়ের হিসাবে। কৃষক, রিকশাচালক, হকার, সরকারি চাকুরে, ফুটপাতের খুদে ব্যবসায়ী, গৃহকর্মী, পোশাক কারখানার মালিক, শ্রমিক- সকলেই মধ্যবিত্ত এবং সকলেরই মাথাপিছু আয় সমান!
সুতরাং কীভাবে বিশ্বের দ্রুততম গতিতে (কুইকেস্ট গ্রোইং) ধনী উৎপাদনের উর্বর ভূমিতে পরিণত বঙ্গভূমি, তার কিছু আলামত দুই যোগ দুই সমান চারের হিসাবের মতো পরিস্কার। আগামী অর্থবছরের বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার জন্য থাকছে অবারিত সুযোগ।
সমাজের কোন শ্রেণির হাতে কালো টাকা? দশজনে যাদের 'সাদা' বলে জানে; প্রতিষ্ঠিত, ক্ষমতাধর এবং 'মাননীয়'। তারাও ক্ষুধায় কাতর- বিত্তের ক্ষুধা। আর পেটের ক্ষুধায় কাতর পাবলিক চোখে যা দেখে তা আসলে তাদের কষ্টের অতীত, দুর্বিষহ বর্তমান, গন্তব্যহীন ভবিষ্যৎ- এই তিনের মিলমিশের অদ্ভুত আঁধার; হুদাই এতে কাব্যিক ছোঁয়া লাগিয়ে 'সর্ষে ফুল' বলা হয়। সবদিক থেকেই 'কালো' এই মানুষদের হাতে না থাকে সাদা টাকার ছিটেফোঁটা, না কালো টাকা করায়ত্তের কারিকুরির কিছুমাত্র তাদের জানা। তারা শুধু জানেন, অন্তবিহীন পথে চলা এ জীবন।
সাংবাদিক
[email protected]
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- হাসান ইমাম