ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

টেলিযোগাযোগ

দুই শতাংশ ন্যূনতম আয়কর কতটা যৌক্তিক

দুই শতাংশ ন্যূনতম আয়কর কতটা যৌক্তিক
×

সাহেদ আলম

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২০ | ০৪:০২

আগামী ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ অভীষ্ট অর্জনে আমরা নিঃসন্দেহে অনেক দূর এগিয়েছি। সরকার ঘোষিত যুগান্তকারী এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবচেয়ে কার্যকর অবদান রেখে চলেছে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ খাতের কর আদায় ব্যবস্থাপনা যেন ডিজিটাল বাংলাদেশ অভীষ্ট অর্জনের বিপরীত ধারায় চলছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ- শুধুমাত্র এ খাতের ওপর প্রযোজ্য ২% ন্যূনতম আয়কর, যেটি এ খাতের অস্তিত্বকেই অনেকটা হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

অনেকে হয়তো ভাবছেন, ২% কর বৃদ্ধি পেলে কী এমন ক্ষতি, এ তো সামান্যই। এই কর হারটি কীভাবে এত ক্ষতিকর সে আলোচনায় যাওয়ার আগে এ খাতের ওপর প্রযোজ্য বর্তমান কর হারের দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। মোবাইল অপারেটররা গ্রাহকের কাছ থেকে যে ১০০ টাকা আয় করে, তার ৫৩ টাকাই নানা ধরনের কর হিসেবে সরকারকে দিয়ে দেয়। এরপর আরও ১৮ থেকে ২০ টাকা চলে যায় অন্যান্য লাইসেন্সধারী সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে। অর্থাৎ ১০০ টাকা আয় করলে কোম্পানি পরিচালনার জন্য অপারেটরদের হাতে থাকে মাত্র ২৮ টাকা। এই অর্থ দিয়েই তাদের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা, কর্মীদের বেতন এবং অন্যান্য সব খরচ নির্বাহ করতে হয়। হঠাৎ জারি হওয়া কোনো আদেশের ভিত্তিতে বড় অঙ্কের রাজস্ব প্রদানের নির্দেশনা কিন্তু এসব খরচে ধরা হয়নি। সেটি হিসাবে ধরা হলে এই ২৮ টাকাও অনেক সময় অপারেটরদের হাতে থাকে না।

এখন আসা যাক, ২% ন্যূনতম আয়করের প্রসঙ্গে। ধরা যাক, ২০১৯ সালে একটি অপারেটরের মোট রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা, এ হিসাবে ২ শতাংশ হারে ন্যূনতম কর দিতে হয় দুই কোটি টাকা। ওই অপারেটরের কর-পূর্ববর্তী মুনাফা (পিবিটি) যদি দুই কোটি টাকা হয় তাহলে ৪৫ শতাংশ হারে করপোরেট কর হিসেবে তাদের দেওয়ার কথা ৯০ লাখ টাকা এবং তাদের কর-পরবর্তী মুনাফা (পিএটি) হওয়ার কথা এক কোটি ১০ লাখ টাকা। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিয়ম অনুসারে এখানে ওই অপারেটরকে দিতে হবে দুই কোটি টাকা। অর্থাৎ মূলধন থেকে অথবা টাকা ধার এনে ওই অপারেটরকে এই দুই কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। শুধু তাই নয়, একটি অপারেটর মুনাফা না করলেও এ হারেই আয়কর দিতে হবে। একটি সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে, ছোট অপারেটরদের মুনাফার ৯৫% কর হিসেবে এনবিআরের কাছে চলে যায়।

দেশের আর কোনো খাতের জন্যই ন্যূনতম করহার ২% নয়। এমনকি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম কর হার ১%। এখানে একটা বিষয় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, পরিপূর্ণ ডিজিটাল ইকোসিস্টেমভিত্তিক একটি সমাজ গড়ে তোলার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে টেলিযোগাযোগ খাত। আমরা ই-কমার্সের মাধ্যমে কেনাকাটা করি, মোবাইল বা অনলাইনে আর্থিক লেনদেন করি, যাতায়াতে অনডিমান্ড রাইড শেয়ার (উবার, পাঠাও ইত্যাদি) ব্যবহার করি, অনলাইনে পড়ালেখা করি, দেশের ভেতরে-বাইরে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করি- সবই হচ্ছে কিন্তু আমাদের হাতের স্মার্টফোন দিয়ে। এ ধরনের একটি শিল্পে এ ধরনের কর আরোপ কেন?

প্রত্যেক দেশেই কর আদায় ব্যবস্থাপনার একটি মূলনীতি বা দর্শন থাকে। দর্শনটি হলো, যে খাতগুলো সমাজ ও জনগণের জন্য কল্যাণকর নয়; কিন্তু সেখান থেকে বড় ধরনের রাজস্ব আয় হয়, সেসব খাতকে নিরুৎসাহিত করার জন্য প্রতি বছরই কর বৃদ্ধি পায়। যেমন- আমরা দেখতে পাই, বাজেট ঘোষণার পরে প্রতি বছরই বিড়ি-সিগারেটের মতো পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। মোবাইল টেলিযোগাযোগ শিল্প নিশ্চিতভাবেই সেরকম কোনো ক্ষতিকর পণ্য বা সেবা উৎপাদন করে না। আবার তামাক ও মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কর হারও একই ৪৫%। ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রেখে চলা একটি খাতের ওপর ঠিক কোন যুক্তিতে প্রতি বছরই সর্বোচ্চ করের বোঝা চাপানো হচ্ছে, সেটি আমাদের কাছে পরিস্কার নয়।

বাংলাদেশের জিডিপিতে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতের অবদান বর্তমানে ৭ শতাংশ, ২০২২ সাল নাগাদ এটি বেড়ে গিয়ে দাঁড়াতে পারে ১০ শতাংশে। এ খাতে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সংখ্যা বর্তমানে আট লাখ ৫০ হাজার। কিন্তু ব্যবসায়িকভাবে মুনাফা না করতে পেরে এ বাজার ছেড়ে চলে যাওয়ার মিছিলটি ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো জাপান, তথা এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি এনটিটি ডোকোমোর বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়া। এর আগে চলে গেছে সিটিসেল, সিংটেল, ওয়ারিদ। এয়ারটেল টিকতে না পেরে রবির সঙ্গে মার্জ করেছে। বর্তমানে যে চারটি অপারেটর টিকে আছে এর মধ্যে একটি ছাড়া কারও অবস্থাই ভালো নয়।

এ দুঃসহ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় পশ্চাৎমুখী রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাপনা ও নীতিমালার বড় ধরনের সংস্কার। ডিজিটাল সেবাভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে সরকারের যে একটি দূরদৃষ্টি আছে, সেটি অনেকটাই ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে কর নীতির কারণে। বর্তমান কর ব্যবস্থা টেলিযোগাযোগ খাতকে একটি একমুখী বাজার ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেটি আমাদের কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।

এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কর আদায় নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনতে হবে। এর প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে শুধু টেলিযোগাযোগ খাতের ওপর প্রযোজ্য ২% ন্যূনতম আয়কর তুলে দেওয়া, অন্ততপক্ষে অন্য সব খাতের মতো ০.৭৫%-এ নামিয়ে আনা। ডিজিটাল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে মোবাইল টেলিযোগাযোগ শিল্পকে রক্ষা করার কোনো বিকল্প এ মুহূর্তে নেই। ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প বাস্তবায়নকারী আমাদের সরকার এ ধরনের বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনবে- এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

×