ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

করোনাকাল

দায়িত্বশীলদের আমলাতান্ত্রিক বক্তব্য

দায়িত্বশীলদের আমলাতান্ত্রিক বক্তব্য
×

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২০ | ১৬:৪৫

বাংলাদেশে কভিড-১৯ এর মাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন বেলা আড়াইটায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন সুদক্ষ কর্মকর্তা প্রেস ব্রিফিং করে থাকেন। সর্বশেষ সার্বিক অবস্থা এবং জনগণের কি করণীয় তা বলেন। আপামর জনসাধারণ দুরুদুরু বক্ষে এই বক্তব্য শ্রবণ করেন। গত ১৮ জুন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বক্তব্য রাখেন। ব্রিফিংয়ের আগে বক্তব্য না বলে সারমর্ম বলা ভালো। যাকে বলা যায় জ্ঞানমূলক উপদেশ। তিনি জনগণকে ধৈর্য ধারণ করতে বললেন। আরও বললেন, করোনা থেকে মুক্তি পেতে ২ মাস কেন ২ বছরও লাগতে পারে।

বিশ্বে অতীতে অনেকবার ভয়াবহ মহামারি এসেছে। অসংখ্য প্রাণহানি হয়েছে, সময় লেগেছে অনেক। প্লেগ যাকে ব্ল্যাক ডেথ বলা হয় ইতিহাসে, সেটি শতাব্দীর বিষয় দুনিয়াকে অস্থির করে রেখেছিল। মারা গেছে কয়েক মিলিয়ন মানুষ। এ ছাড়া কলেরা, জলবসন্ত, যক্ষ্ণা এসবও ভয়াবহ আকারে দেখা গিয়েছিল। অধুনা বিশ্বেও তো এইডস, সার্স, ইবোলা এসব মহামারি আকারে এসেছে। পৃথিবীতে আজ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত। তাই অতিদ্রুত সব তথ্য সবখানে পাওয়া যায়। বর্তমানে কভিড-১৯ এ বিশ্ব কাঁপছে। প্রথমে চীনে শুরু হয় ২০১৯ সালের নভেম্বরে। চীনের অজ্ঞতা কিংবা দায়িত্বহীনতা কিংবা ঔদাসীন্য যে কারণে হোক এই ভয়াবহ আক্রমণের বিপদ বিশ্বকে ঠিকমতো অবহিত করে পারেনি। এখন যে যাই বলুক, এটা একটা চরম ব্যর্থতা। কভিডের মূল প্রতিরোধক লকডাউন। অর্থাৎ যতদূর সম্ভব ঘরে আবদ্ধ থাকা। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে আমাদের নবী হজরত মুহম্মদ (সা.) এই নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোথাও মহামারি দেখা গেলে সেখান থেকে কেউ বাইরে আসবেন না এবং বাইরে থেকে সেখানে কেউ ঢুকবেন না। আজও সেটি মূল পন্থা। ইতোমধ্যে প্রতিষেধক এবং চিকিৎসা আবিস্কৃত হয়েছে। এসব মহামারি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে এই মহামারি আগমনের আগাম আগমন সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারে না। এমনকি এই ভাইরাসের গতিবিধি এবং বৈশিষ্ট্য কি তাও কেউ বলতে পারে না।

কভিড-১৯ ভাইরাস সম্পর্কে আবশ্য দেশে-বিদেশে বেশকিছু বিশ্নেষণ এসেছে। এতে কি উপকার হবে জানি না, তবে মহামারি তার কাজটি নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান অবস্থায় স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব অনেক। এদিকে কভিড-১৯ মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের অনেক মুক্তিযোদ্ধা তথা চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগ এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কী করছে। এখন পর্যন্ত চিকিৎসার কাজকর্মে কোনো শৃঙ্খলা আসেনি। রোগী এ হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল করতে গিয়ে রাস্তায় প্রাণ হারান। ভিআইপি কভিড রোগীরা কিছুটা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন। আর সাধারণ রোগীরা যেখানে-সেখানে মরে থাকেন। ফলে মৃত্যুর হার সম্পর্কে নানা গুজব ছড়িয়ে যায়। নভেম্বর মাসে চীনে কভিডের আক্রমণ ঘটে। আমরা চার মাস সময় পেলাম এতে পিইপি, অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর এবং অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। প্রয়োজন বোধে অত্যন্ত জরুরিভিত্তিতে দ্রব্যাদি আমদানি করতে পারত। কল্যাণপুরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কভিড চিকিৎসায় আয়োজন করেছে নিজ উদ্যোগ। নগদ টাকা নিয়ে ঘুরছে, কিন্তু অক্সিজেন সিলিন্ডার পাচ্ছে না। স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক যে জ্ঞান দান করেছেন, তার প্রয়োজন ছিল না। আমরা জানি যে, আজ ৮ মাসে বিজ্ঞানের এত উন্নতির পরও না কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসায় না কোনো ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা হয়েছে। কবে হবে তা ওপরওয়ালা জানেন। কিন্তু স্বাভাবিক কিছু চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগ ও মন্ত্রণালয় সেটুকু যেন আক্রান্ত হওয়া রোগীরা পান- সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি। এখনও কেন পিপিই বা অন্যান্য সামগ্রীর অভাব থাকবে। প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় ভিটামিন-সি এর কথা বলা হয়। পেটে ভাত জোটানো যখন কঠিন হয় তখন ভিটামিন-সি এর কথা অবান্তর। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প সমিতি অত্যন্ত সম্পদশালী। স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের সঙ্গে কথা বলে ভিটামিন-সি বিতরণের ব্যবস্থা করতে পারে না? কভিড-১৯ আতঙ্ক ছড়ানো মহামারি আতঙ্কে চিকিৎসা ব্যবস্থা এমনভাবে ভেঙে পড়েছে যে- এখন কভিড না অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কোনো চিকিৎসা পান না। এ এক ভয়াবহ অসহায় অবস্থা। আমাদের প্রত্যাশা, স্বাস্থ্য বিভাগের কভিডের চিকিৎসায় যে নূ্যনতম সুযোগ রয়েছে, তা যেন আক্রান্ত হওয়া রোগীরা পেয়ে থাকেন। মানুষকে একটু আশার আলো দেখাবেন স্বাস্থ্য বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

মানুষের দ্বারা আবিস্কৃত চিকিৎসা ব্যবস্থার ফলে তো অতীতের মহামারি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের সাধ্য অনুযায়ী মানুষের সেবা করবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। বাংলাদেশের মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কর্মকর্তায় সমৃদ্ধ। জনবলের অভাব রয়েছে এ কথা বলার সুযোগ নেই। বর্তমান সরকার তাদের অনেক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেছে। ২০২০ সাল মুজিববর্ষ। বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তব্যের উল্লেখ করতে চাই। তার মতো জননেতা বলে এই সত্যটা জনসভায় বলেছিলেন যে- চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ারসহ সকল কর্মকর্তা বিদ্যা অর্জন করেন, তাতে গরিব কৃষক, শ্রমিক সকলের অর্থের আবেদন রয়েছে, আপনাদের দায়িত্ব তাদের সেবা করা, দুর্ভাগ্য আজও সে অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। সাধারণ মানুষ একজন কর্মকর্তা তিনি যত নিম্নপদের হোক না কেন, তাকে স্যার বলে সম্বোধন না করলে তার কোনো কথাই কর্তাব্যক্তি শুনবেন না। আর একটি প্রসঙ্গ মনে হলো ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। মশক নিধন করলে রোগটি থেকে রেহাই পাওয়া যায়। এই কাজটিও স্বাস্থ্য বিভাগ ও মন্ত্রণালয় করতে পারছে না। উপদেশ দেয়, দিন-রাত মশারির নিচে বসে থাকতে। কোনো সুস্থ মস্তিস্ক থেকে এ রকম পরামর্শ আসতে পারে না।

আমাদের সোজা কথা, আমরা জ্ঞানের কথা আর শুনতে চাই না। আমরা পণ্ডিত না হলেও মূর্খ নই। আপনারা আপনাদের দায়িত্ব পালন করুন। এই যে প্রতিনিয়ত করোনা টেস্টের কথা বলা হয়, সে কাজটা করতে গেলেও রোগীকে চরম হয়রানি হতে হয়। আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়তে হয় রোগীকে। স্বাস্থ্য বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এসব হয়রানির অবসান ঘটান

কলাম লেখক ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা

আরও পড়ুন

×