ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

সমাজ

বর্ণবিদ্বেষ মানব সভ্যতার অভিশাপ

বর্ণবিদ্বেষ মানব সভ্যতার অভিশাপ
×

হারুন হাবীব

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২০ | ১৬:৪৫

অনেক বছর আগে আফ্রিকান-আমেরিকান লেখক অ্যালেক্স হেলির সাড়া জাগানো ১৯৭৬ সালের 'রুটস' উপন্যাসটি যখন পড়ি, তখন আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। উপন্যাসের কাহিনি ঘিরে আছে লেখকের ১৮ শতাব্দীর এক বংশধর, নাম কুনতা কিনতে, যাকে আফ্রিকার গাম্বিয়া থেকে আমেরিকায় আনা হয়েছিল দাস হিসেবে। এই বইয়ের ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন বটে, কিন্তু কালো মানুষদের বিষণ্ণ অতীতে যা ঘটেছে, তা অস্বীকার করার নয়।

সংক্ষিপ্তাকারে বলতে গেলে আমেরিকার সমাজে ঝড় তোলা নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সূত্রপাত করেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, যিনি ১৯৫৫ থেকে তার হত্যাকাণ্ডের বছর, অর্থাৎ ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত এই আন্দোলন পরিচালনা করেন। সেই আন্দোলন ছিল কালোদের নাগরিক অধিকার ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা। লুথার কিং তার অহিংস আন্দোলনের অনুপ্রেরণা লাভ করেন অহিংসবাদী নেতা মহাত্মা গান্ধীর কাছ থেকে। তিনি একই সঙ্গে লড়েছেন ক্ষুধা, পুঁজিবাদ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে। কিং শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন ১৯৬৪ সালে। শুধু তাই নয়, শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের প্রবল আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন যিনি, তাকেই মার্কিন রাষ্ট্র কয়েকটি সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মানে বরণ করে। আমেরিকার অলিগলিতে প্রতিষ্ঠিত হয় তার নামে সড়ক, খোদ ওয়াশিংটনে গড়ে ওঠে মার্টিন লুথার কিং সরণি। তারই 'আই হ্যাভ এ ড্রিম' ভাষণটি অনাদিকাল ধরে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হয়ে থাকবে।

আফ্রিকানরা কি সত্যি সত্যিই 'নীচু শ্রেণির' ছিল? অন্তত কিছু ইউরোপিয়ানের অভিজ্ঞতায় তা দেখা যায় না। ১৫ এবং ১৬ শতাব্দীতে পর্তুগিজ নাবিকরা যখন প্রথম আফ্রিকা মহাদেশে পৌঁছে, তখন তারা সেখানে সাম্রাজ্য ও সভ্যতা দেখতে পান, যা তাদের চাইতে নিচু মানের ছিল না। কিন্তু ক্রমান্বয়ে আফ্রিকার সভ্যতা ইউরোপীয় সভ্যতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। পারে না তার বড় কারণ বলদর্পী ইউরোপীয়রা শক্তির জোরে আফ্রিকা মহাদেশের সম্পদ লুট করতে থাকে এবং তাদের বিনাশ করে।

আমেরিকার বর্ণবাদ নতুন নয়, ছিল সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকেই। সেখানে সাদাদের জন্য আইনগত সুযোগ-সুবিধা যা ছিল, তা কালোদের জন্য ছিল না। তবে এই আধুনিক কালেও যে সে অভিশাপ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে- তা কেউ ভাবতে পারেনি! কিন্তু গত মার্চ মাসের শেষে মিনিয়াপলিসে জর্জ ফ্লয়েড নামের এক কালো মানুষ যখন সাদা পুলিশের হাতে নির্মমভাবে এবং প্রকাশ্যে নিহত হলেন, এবং সেই ঘটনা নিয়ে গোটা আমেরিকা যখন বিক্ষোভে ফেটে পড়ল, তখন প্রশ্ন করার অবকাশ থাকে যে, পুরোনো কলঙ্কময় অধ্যায়ের সেই বীজ কি নতুন করে গজিয়ে উঠছে? কেবল জর্জ ফ্লয়েড নন, এমনি আরও কিছু কালো মানুষের পুলিশি হত্যাকাণ্ড সচেতন মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। কেউ কেউ এটিও মনে করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, আমেরিকার সৃষ্টিকালে যে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, যাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, এমনকি পরবর্তী সময়ে যে নাগরিক অধিকার আন্দোলন ঘটেছে, সেসব কি ভুলে যেতে বসেছে আমেরিকা? প্রাচীন সেই মানসিকতার ভূত বিশ্বের শক্তিধর দেশটিতে কি পুনরাভিযান শুরু করেছে!

যুক্তরাষ্ট্রের 'হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্ক'-এর মতে, দেশটিতে কালো মানুষের প্রতি একটা বড় অসমতা বিদ্যমান। এবিসি নিউজের সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই আধুনিক যুগেও আমেরিকার ব্যাপক সংখ্যক মানুষ অসমতার ব্যাপারটি স্বীকার করেন। মাত্র কয়েক বছর আগে বারাক ওবামা যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতে আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম কালো প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন বহু আমেরিকান ভাষ্যকার সেই বিজয়কে বর্ণবাদবিরোধী প্রথম যুগের সূচনা করল বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। অবশ্য ওবামার যুগ শেষ হলে ২০১৬ সালে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে জিতে প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন তাকে বর্ণবাদীদের ফিরে আসা হিসেবেই দেখা হয়েছে।

জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের পর 'ব্লেক লাইভস মেটার' বা কালোদের জীবনের মূল্য আছে স্লোগানে যে গণআন্দোলন শুরু হয়েছে, তা দেশের বেশির ভাগ শহরে বিস্তৃত হয়েছে। এই আন্দোলন আরেক দফা গতি পেয়েছে যখন আটলান্টায় শ্ব্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে আরেক কালো মানুষের মৃত্যু ঘটেছে জুন মাসে। দৃশ্যতই এই আন্দোলন আমেরিকার ইতিহাসে নজিরবিহীন। এই প্রতিবাদ এরই মধ্যে আমেরিকার আইন, বিচার বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কার আনার পক্ষে জোরালো গণদাবি বলে পরিগণিত হচ্ছে। আন্দোলন কেবল আমেরিকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় সারা বিশ্বে।

ব্যাপক আন্দোলনের ফলে মার্কিন প্রশাসন বাধ্য হয়ে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকারী শ্বেতাঙ্গ পুলিশদের গ্রেপ্তার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ উত্থাপন করেছে। ড্রিক চাউভিন নামের যে পুলিশ কর্মকর্তা, যাকে দেখা গেছে ফ্লয়েডকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করতে, তার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ হত্যার মামলা দায়ের করা হয়েছে। বলা বাহুল্য এসব নিঃসন্দেহে শুভ পদক্ষেপ।

এই জাত বিদ্বেষবিরোধী আন্দোলন কালোদের মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ থাকেনি, আমেরিকা ও পৃথিবীর সব প্রান্তেই কালোদের সঙ্গে সাদা ও বাদামি মানুষ যুক্ত হয়েছে হাজারে হাজারে। ওরা সকলেই 'ব্লেক লাইভস ম্যাটার' প্ল্যাকার্ড ধরে সুবিচার ও সামাজিক সাম্যের দাবি তুলেছে। তারা ওয়াশিংটন বা আমেরিকার প্রধান নগরীগুলোকেই প্রকম্পিত করেনি, একই সঙ্গে তারা জোরালো কণ্ঠস্বর শুনিয়ে যাচ্ছে লন্ডন, বার্লিন, প্যারিস, মাদ্রিদ, রোম, সিডনি এবং আরও অসংখ্য বিশ্ব নগরীতে। দৃশ্যতই, করোনা মহামারির এই সময়ে, আমেরিকায় যেখানে এ যাবত এক লাখেরও বেশি মানুষ মারা গেছে, সেখানে বিদ্যমান আন্দোলনকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাসনামলের সবচাইতে বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই আন্দোলন ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক অতীত আলোচনায় তুলেছে নতুন করে। ব্রিস্টলে এডওয়ার্ড কলস্টনের ১৭০০ শতাব্দীর একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই কলস্টন ছিলেন বড় দাস ব্যবসায়ী যিনি আফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চল থেকে কালোদের নিয়ে এসে বিক্রি করে বিশাল ধনী হয়েছিলেন। এই দাস ব্যবসায়ী কমপক্ষে ৮০ হাজার কালো মানুষকে এনে বিক্রি করেন এবং বিপদ সংকুল সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ মারা যায় তার ব্যবসার কল্যাণে। এদিকে লন্ডন মিউজিয়ামের বাইরে অন্য এক দাস ব্যবসায়ী, রবার্ট মিলিগানের মূর্তি সরিয়ে ফেলা হয়েছে আন্দোলকারীদের ভয়ে। এ ব্যাপারে লন্ডন মেয়র সাদিক খানের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন- এটা নির্মম সত্য যে, ব্রিটেনের প্রায় সব নগরী ও রাষ্ট্রের সম্পদের বেশির ভাগেরই জোগান এসেছে ঔপনিবেশিক আমলের দাস ব্যবসা থেকে। কাজেই সেই ইতিহাসের সাক্ষীগুলোকে প্রকাশ্য স্থানে না রাখাই ভালো।

এদিকে লন্ডন কর্তৃপক্ষ যখন স্যার উইন্সটন চার্চিলের মূর্তিটি রক্ষার জন্য পাহারার ব্যবস্থা করেন, তখন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন অভিযোগ করেন- আন্দোলনটি 'চরমপন্থিরা হাইজ্যাক' করে নিতে যাচ্ছে। মি. জনসনের অভিযোগ কতটা প্রমাণিত তা জানা যায়নি, তবে এমন কোনো দৃষ্টান্ত দেখা দিলে তা সুখকর হবে না। এটি সত্য যে, ইতিহাসকে সম্পাদনা করা যায় না বা মুছে দেওয়া যায় না। তবে এ প্রশ্নও করা যায় যে, এই আধুনিক যুগেও কি সেই মানুষেরা সম্মানিত হতে পারেন, যারা নির্মমতা ও দাস ব্যবসার মতো নিকৃষ্ট কাজে যুক্ত ছিলেন?

মনে রাখা উচিত, এই জাতবিদ্বেষ একসময় নাৎসি জার্মানির হাতে নির্মম ইহুদি নিধনযজ্ঞ ঘটিয়েছিল ইউরোপে। এই মানসিকতাই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকদের হাতে ত্রিশ লাখ বাঙালির গণহত্যা সম্পন্ন করতে সাহায্য করেছিল। কারণ পাকিস্তানি শাসকরা স্থিরচিত্ত ছিল যে, বাঙালিরা তাদের চেয়ে নীচু জাতের মুসলমান! এমনকি আফ্রিকার মাটি রুয়ান্ডায় এই মানসিকতা লাখো মানুষের হত্যাকাণ্ডের কারণ হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সুদীর্ঘকাল ধরে বর্ণবাদ জেঁকে বসে কীভাবে কালো মানুষের জীবনে অভিশাপ এনেছিল, সেই ইতিহাসও তেমন প্রাচীন নয়।

কাজেই যত দ্রুত এই অভিশাপ মুক্ত হওয়া যায়, তত দ্রুত একটি সমাজ ও রাষ্ট্র শাপমুক্ত হবে। কারণ এই অদৃশ্য দানব সমাজে ভেতর থেকে দুর্বল করে। তবে আইন দিয়েই কেবল কাজটি সম্ভব নয়। প্রয়োজন সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও। আমেরিকার সমাজে সে কারণেই আত্মানুসন্ধান প্রয়োজন। মনে রাখা উচিত যে, কালোদের অধিকার দিলে তা কেবল কালোদেরই সম্মানিত করবে না, একই সঙ্গে দেশটির বৃহত্তর শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকেও মর্যাদাবান করবে।

দাসপ্রথা বর্ণবাদেরই চূড়ান্ত রূপ। এই দাসপ্রথা নিয়ে আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ যিনি দেশটিকে বহু মানবিক, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকটে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছেন, তার একটি বক্তব্য স্মরণযোগ্য- 'আমি দাসপ্রথাকে ঘৃণা করি কারণ এই প্রথা দানবতুল্য; আমি একে ঘৃণা করি কারণ এই প্রথা বিশ্বে আমাদের সম্মান রক্ষিত করে না; আমি এই প্রথাকে ঘৃণা করি কারণ এই প্রথা আমাদের স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে; আমি একে ঘৃণা করি কারণ এই দুষ্টক্ষত আমাদের সদিচ্ছাকে সন্দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করে; এই প্রথা আমাদের রাষ্ট্রের ভালো দিকগুলোকে, সিভিল লিবার্টি ও স্বাধীনতার সনদকে কলঙ্কিত করে।

লেখক, বিশ্নেষক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×