সমকালীন প্রসঙ্গ
কার গ্রামে কে ফেরে
শেখ রোকন
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২০ | ০১:০৪
ফিরতে কে না চায়? আমরা প্রতীকী অর্থে শেকড়ের কাছে ফেরার কথা বলি, প্রকৃত অর্থে প্রকৃতির কাছে ফেরার কথা বলি। এই যে মানবজীবনে শৈশব থেকে ক্রমেই বার্ধক্যে পৌঁছা, সেটাও নাকি জৈবিক ও মানসিকভাবে শৈশবেই ফেরার নামান্তর। ফেলে আসা দিনের গল্প সবচেয়ে বড় নস্টালজিয়ার নাম। জীবনানন্দ দাশ বলেছেন- জীবনের সব লেনদেন ফুরালে সব পাখি, সব নদীই ঘরে ফিরতে চায়। কিন্তু চাইলেই কি ফেরা যায়? সবাই কি ফিরতে পারে?
কেউ কেউ যে ফিরতে পারে, গত কিছুদিন ধরে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে স্পষ্ট হচ্ছে। পিকআপ বা ট্রাকে গাদাগাদি করে তোলা গৃহস্থালি জিনিসপত্র নিয়ে রাজপথে নেমেছে কিছু মানুষ। ঢাকা নগরীর কথা যদি বলি- মাসের শুরুর দুই-একদিন এভাবে লেপ-তোষক, টেবিল-চেয়ার, খুন্তি-কড়াই পিকআপে বা ভ্যানে নিয়ে বাসাবদলের দৃশ্য মাসের শুরুর দুই-একদিন বিরল নয়। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিনই যেন আগের দিনের চেয়ে সংখ্যাটা বাড়ছে। তার মানে, কিছু মানুষ শহর ছাড়ছে। সংবাদমাধ্যম বলছে, শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরছে তারা।
ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো নগরী ছেড়ে দলে দলে মানুষ গ্রামে ফেরার দৃশ্য আমাদের জন্য নতুন নয়। ঈদের মতো সর্বজনীন উৎসবে বাস-ট্রেনে ঝুলে ঝুলে তো বটেই, ট্রাকে গাদাগাদি করেও মানুষের শহর ছাড়ার দৃশ্য দেখা যায়। সংবাদপত্রগুলো লেখে 'নাড়ির টানে' ঘরে ফিরছে মানুষ। এবারের ফেরা সেই ফেরার মতো নয়। যানজট, বাহন সংকট সত্ত্বেও সেই ফেরার মধ্যে মানুষের চোখে-মুখে আনন্দ ঝলমল করে। প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ, উপহার ও অর্থ নিয়ে ফেরার আনন্দ। এবার যানজট নেই, ঝুলে ঝুলে ফিরতে হচ্ছে না। আষাঢ়ের আবহাওয়াও চমৎকার। কিন্তু শহর ছেড়ে যাওয়া মুখগুলো বিষণ্ণ। তাদের কেউ কেউ হয়তো শহরে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগই ছাড়ছে বাধ্য হয়ে।
করোনা যখন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছিল- আমরা শুনেছিলাম যে কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। প্রথম ধাক্কা স্পষ্ট হয়েছিল স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়। এখনো হাসপাতালে গেলে সাধারণ রোগের চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। যে করোনা পরীক্ষা ও ব্যবস্থাপনার দোহাই দিয়ে বাকি রোগের চিকিৎসাও দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে, সেটাও কতখানি মিলছে সন্দেহ রয়েছে। প্রথম ঢেউ সামলাতে না সামলাতেই করোনা সাগরে দ্বিতীয় ঢেউ হিসেবে এসেছে কর্মহীনতা।
ঢাকাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা পলিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, করোনা পরিস্থিতিতে এপ্রিল পর্যন্ত দেশে দেড় কোটি মানুষ কর্মহীন হয়েছে। ব্র্যাক, ডাটাসেন্স ও উন্নয়ন সমুন্নয়ের যৌথভাবে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, ১০ কোটি ২২ লাখ মানুষ রয়েছে আর্থিক ঝুঁকিতে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৪ ভাগ পরিবার জানিয়েছে, তাদের পরিবারে কেউ না কেউ চাকরি হারিয়েছে। এসব তথ্য দিয়ে মঙ্গলবার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইংরেজি দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। ওদিকে ১৪ লাখ প্রবাসী শ্রমিক হয় ইতোমধ্যে দেশে ফিরেছে বা ফেরার পথে রয়েছে। এদের অনেকে সর্বস্ব বিক্রি করে বা ঋণ করে সোনার হরিণ ধরতে বিদেশ গিয়েছিল। ফিরছে খালি হাতে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণের দায় নিয়ে।
শহর থেকে গ্রামে ফেরা মানুষগুলোর পরিস্থিতিও তথৈবচ। তাদের অনেকে এই শহরে থাকতে এসেছিল। কিন্তু থাকতে পারছে না। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, করোনাকালের কর্মহীনতায় নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের মূল সংকট বাসা ভাড়া সামলানো। তাদের বেশিরভাগেরই প্রতি মাসের বাসা ভাড়া ও বাজার খরচের অর্থ কায়ক্লেশে উপার্জন হয়। সঞ্চয় থাকে না। চাকরি বা ব্যবসা যখন নেই, তখন এই মাসিক 'ভারসাম্য' নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ কেউ নিজে মেসে উঠে পরিবারকে গ্রামে রেখে আসছেন। কেউ কেউ সপরিবারে চলেই যাচ্ছেন। এই অনিবার্য বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে নানা হৃদয়বিদারক দৃশ্য।

কয়েকদিন আগে সময় টেলিভিশনে একটি প্রতিবেদন দেখছিলাম। রাতের আঁধারে ট্রাকে মালপত্র তুলতে তুলতে, চোখ মুছতে মুছতে প্রৌঢ় গৃহকর্তা আক্ষেপের সঙ্গে বলছিলেন- ৫০ বছর আগে ঢাকা শহরে এসেছিলেন। অর্ধশতক পার করেও শহরটি নিজের হয়নি। যারা ঋণ নিয়ে, সর্বস্ব বাজি ধরে বাড়ি বানিয়ে 'নিজের' করে নিয়েছেন, তাদের পরিস্থিতিও খারাপ। ভাড়াটে বা ভাড়া কমতে থাকলে তারা চলবেন কীভাবে? ভাড়াটিয়া পরিষদ একটি গড় হিসাব করে বলছে, অন্তত ৫০ হাজার ভাড়াটে ঢাকা শহর ছেড়েছে। এই সংখ্যা নিঃসন্দেহে আরও বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রে।
শহর ছেড়ে যাওয়া এসব মানুষ গ্রামে গিয়ে কী করবে? গ্রামাঞ্চলে কর্মহীনতার কারণেই তো তাদের বেশিরভাগ শহরে এসেছিল। দিদারুল নামে এক প্রাইভেট গাড়িচালক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন- গ্রামের দিকে 'কিছু একটা' করে খাওয়া যাবে। আত্মীয়রা প্রথম কয়দিন জায়গা দিলে ব্যবস্থা একটা হবে। দিদারুলদের প্রত্যাশা কতখানি পূরণ হবে, বলা মুশকিল। জনবহুল শহরে 'কিছু একটা' করে জীবিকা নির্বাহ যতটা সহজ, মফস্বলে বা গ্রামে ততটা সহজ নয়। সেখানকার সীমিত ব্যবসা, উদ্যোগ, চাকরি, এমনকি মাঠের কাজও কি স্থায়ী বাসিন্দাদের দখলে নয়? নতুন জনগোষ্ঠীকে ছাড়ার মতো জায়গা কোথায়? কে বা বিনা রণে ছাড়বে সূচ্যগ্র মেদিনী?
আমরা সময় ও স্রোতের কথা বলি; কিন্তু জগতে কোনো কিছুই কারও জন্য অপেক্ষা করে না। এক বা দুই কিংবা তারও বেশি দশক আগে ছেড়ে আসা গ্রামগুলো কি আগের মতো স্বাগত জানাবে তাদের? কি গ্রাম, কি শহর- সবই প্রায় প্রতিনিয়ত বদলায়; আমরা প্রতিদিন দেখি বলে টের পাই না। ঈদে-উৎসবে ফেরা একরকম। যত নিকটাত্মীয়ই হোক, বেড়াতে গিয়ে এক-দুই সপ্তাহ অবস্থান করা একরকম। কিন্তু সবকিছু গুটিয়ে নিয়ে ফেরা এই 'শহুরে' জনগোষ্ঠীকে গ্রামের মানুষ কীভাবে স্বাগত জানাবে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।
করোনাকালের কথাও ভাবতে হবে। দশক দশক ধরে যে প্রবাসী বাংলাদেশিরা আমাদের সমাজে ছিল সবচেয়ে আদৃত। প্রতীকী অর্থে 'জামাই আদর' পেতেন। তাদের অনেকে এবার প্রকৃত শ্বশুরবাড়িতেও সামান্য ঠাঁই পাননি। ইউরোপে করোনার প্রকোপ দেখে কমবেশি ৩৬ হাজার বাংলাদেশি দেশে 'ফিরে' এসেছিলেন। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরু হওয়ার প্রথম সুযোগেই তারা প্রবাসে 'ফিরছেন'। পেছনে থাকছে তিক্ত অভিজ্ঞতা।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের তাও দ্বিতীয় সুযোগ ছিল। গ্রামে ফিরে যদি প্রত্যাশিত গ্রাম ফিরে না পান, শহরের বসবাস তুলে যাওয়া না-শহুরে না-গ্রামীণ এই জনগোষ্ঠী কী করবে? এতদিন দূরে অবস্থানের সুবাদে মিলেমিশে থাকা স্বজনের মধ্যে যদি জমিজমা, সম্পত্তি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যা বাড়ে, অবাক হওয়ার কিছু নেই। অনেকের জন্য গ্রামে টিকে থাকার লড়াই শহরের চেয়েও জটিল ও কঠিন হতে পারে। কথাগুলো শুনতে তিক্ত; কিন্তু বাস্তবতা তিক্ততর।
কবি আল মাহমুদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- 'যদি পড়ে কহর, তবু ছেড়ো না শহর'। কহর মানে দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ, শাপ। যারা শহর ছাড়ছেন- এই লেখা যদি তাদের কারও চোখে পড়ে, প্রয়াত কবির উচ্চারিত প্রবচনটি মনে করিয়ে দিতে চাই।
লেখক ও গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- শেখ রোকন