ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

সমাজ

বেঁচে থাকুক মেয়েরা ঘরে ও বাইরে

বেঁচে থাকুক মেয়েরা ঘরে ও বাইরে
×

দিলরুবা সরমিন

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২০ | ১৫:৪৬

ফেসবুকে কিছু স্থূল জোকস (কার্টুন আকারে) এই করোনাকালে ক্রমাগত ভাইরাল হয়েছে- 'ছেলেরা গৃহবন্দি', 'সংসারের কাজ করছে', 'বউদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে' ইত্যাদি। বেশির ভাগ পোস্টই ছেলেদের দেওয়া হলেও কিছু মেয়ে সেখানে 'হা হা' রি-অ্যাক্ট দিয়েছেন। পোস্ট দেওয়া বা রি-অ্যাকশন দেওয়া যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেখানে আমি সম্পূর্ণ ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তবে প্রশ্ন হলো- কেবল এই ক'মাসেই হাঁফিয়ে উঠেছেন যারা, তারা কি একবারও ভেবেছেন যুগের পর যুগ মেয়েরা এই 'করোনাকাল' কাটাচ্ছেন?

একজন কর্মজীবী মেয়ে ঘরে এবং কর্মস্থলেও একই সময় পার করেন। আর গৃহবধূদের তো কোনো কথাই নেই। তাদের সারাজীবনই করোনাকাল।

থানা অসহযোগিতা করায় নিয়মিত আদালত প্রক্রিয়াবন্দি থাকায় অসংখ্য মেয়ে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবারে রেগুলার মেসেজে বা ফোনে তাদের দুর্দশার কথা নিয়মিতই জানাচ্ছেন। কেবল পরামর্শ দেওয়া আর লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া ছাড়া তাদের জন্য আর কিছুই করতে পারছি না।

এসব মেয়ে সবাই যে কেবল গৃহবধূ তা নয়। কর্মজীবী নারীও আছেন। করোনার ভয়ে ভীত না হয়ে একান্ত বাধ্য হয়ে অফিসে যেতে হচ্ছে তাদের। ঘরে নির্যাতিত হয়েও কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছেন না।

ক'দিন দেখছি একটি লেখা- করোনাকালে বিয়ে বিচ্ছেদ কমেছে। কেবল বিয়ে বিচ্ছেদ কমাই কি সংসারে সুখ-শান্তি ফিরে আসার লক্ষণ?

আরও লেখা হচ্ছে- মেয়েরা ৭০ শতাংশ তালাক দেন আর ছেলেরা ৩০ শতাংশ। কোথা থেকে এই পরিসংখ্যান বের করা হয়েছে জানি না। তবে জানি ছেলেদের হার মেয়েদের তুলনায় কম কেন।

আমাদের দেশের সাধারণ ধারণা, ছেলেরা তালাক দিলেই কেবল দেনমোহর, খোরপোশ দিতে হবে। মেয়েরা দিলে দিতে হবে না। যা সম্পূর্ণ ভুল। মুসলিম বিয়ে একটি সিভিল কন্ট্র্যাক্ট। এখানে যে কোনো এক পক্ষ যে কোনো কারণে অন্য পক্ষকে তালাক দিলেই বা বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটালে কেবল দেনমোহরের বিষয় উত্থাপিত হবে, নইলে না- সেটি ভুল ধারণা। দেনমোহর বিয়ের সময়ই ধার্য এবং প্রাপ্য হয়। কেউ তখনই পরিশোধ করেন, কেউ-বা পরে। তবে অধিকাংশ স্বামীই যেনতেন উপায়ে এটা মাফ চেয়ে নেন বাসর রাতেই। যা আইনত বৈধ নয়। ধর্মেও সিদ্ধ নয়। স্ত্রীকে বাসর রাতে স্পর্শ করার আগেই দেনমোহর পরিশোধ করার কথা ইসলাম ধর্মে বলা আছে।

খুব কম ক্ষেত্রেই মেয়েরা বৈবাহিক জীবনে দেনমোহর আদায় করতে পারেন। আবেগ, স্বামীর সঙ্গে সুসম্পর্ক, নিজেকে নির্লোভ প্রমাণের চেষ্টা, সংসার টিকিয়ে রাখা- সব মিলিয়ে মেয়েরা এসব এড়িয়ে চলেন। যখন সংসারে গলা ধাক্কা খান বা সংসার যখন নরক হয়ে ওঠে, তালাক যখন অনিবার্য হয়ে পড়ে- তখন মেয়েরা জীবন বাঁচাতে দেনমোহর চান। তবে তারা খুব সহজে ও ভদ্রভাবে সেটি পান তা নয়। তার জন্য মেয়েটিকে আইনজীবী ও আদালতের পেছনে ঘুরে ঘুরে আরেক নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। যা তার ন্যায্য অধিকার, সেটি আদায়ে তাকে নানা কথা- 'লোভী, দেনমোহরের জন্যই বিয়ে করেছিল, এটিই ব্যবসা' শুনতে হয়। এ সবই যে একেবারেই মিথ্যা, বিষয়টি তেমন নয়। ক্ষেত্রবিশেষে মানুষের চরিত্র তো বিচিত্র থাকবেই।

এর মাঝেও কোনো কোনো মেয়ে নির্যাতন ও প্রতারণার চূড়ান্ত শিকার হয়ে থানা পুলিশের আশ্রয়ে মামলা করছেন বটে কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত থানা পুলিশ সেসব নারী নির্যাতকদের খুঁজেই পাচ্ছে না; তবে তারা দিব্যি অফিস করছেন- তাদের পাবে কেমন করে! সেলুকাস!

এরপর তো আরও আছে। করোনাকালে মেয়েদের কথা আর কত শুনবেন? রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে লালিত-পালিত মাথাওয়ালাদের ছেলেরা ভুলেই যান যাকে তিনি বিয়ে করেছিলেন, তার গর্ভেই হয়েছে যে শিশুটি, সেই মাকে এই করোনাকালেই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন বাচ্চা আটকে রেখে। এক মা তো বাচ্চাকে দেখতে ফি বছর বিদেশে কাজ করে টাকা জমান মামলা করে বাচ্চা উদ্ধারের জন্য, আর প্রতিবার দিয়ে যান আইন-আদালতের নানা প্যাঁচে পড়ে। আরেক মা লেখাপড়া করছেন সেই অজুহাতে বাচ্চা কেড়ে নিয়েছেন বাবা। যাতে আটকে যায় স্ত্রীর পড়াশোনা। আরেক বাবা তো আরেকটা বিয়ে করে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন নতুন বউ নিয়ে। এদিকে মা বাচ্চা নিয়ে পড়েছেন অথৈ সাগরে। না পারছেন স্কুলে বাবার নাম দিয়ে কাগজে বাবার স্বাক্ষর জমা দিতে, আর অন্যদিকে স্কুল কর্তৃপক্ষ সন্তানের জন্মের বৈধতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছে। ফলে বাচ্চার শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

ভাবছেন করোনাকালে এক গ্লাস পানি ঢেলে খেয়েই বা বিছানাটা একটু গুছিয়েই ছেলেরা খুব বন্দিশালায় আছেন? ছেলেরা ঘরে থাকায় মেয়েদের বন্দিদশা আরও চার গুণ বেড়েছে। সংসারের যাবতীয় কাজ করার পাশাপাশি ফুটফরমাশ খেটেও কোনোভাবে স্বামীকে সন্তুষ্ট করা যাচ্ছে না।

তাহলে কি এভাবেই চলবে মেয়েদের জীবন? চিরদিনই করোনাকাল? বিয়ে করে 'অংশীদারের অধিকার নয় বিনা পয়সায় সেবাদাসী', 'জন্ম দিয়ে মাতৃত্বের অধিকার নয় বিনা পয়সায় গভর্নেস'। প্রতিবাদী মেয়েটি সংসারে-সমাজে 'খারাপ'। ডিভোর্সি মেয়েটির 'চরিত্র ভালো না'- এসবই শুনতে হয়।

মেয়েদের করোনাকাল কোনোদিনই কাটবে না এটা নিশ্চিত থাকুন। মেয়েরা বেঁচে মরে থাকবেন আজীবন। মেয়েরা তবু বেঁচে থাকুক যেভাবেই হোক। জীবন অনেক সুন্দর। বেঁচে থাকার আনন্দই আলাদা।

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

আরও পড়ুন

×