স্মরণ
শৈলজারঞ্জন মজুমদার ও হুমায়ূন আহমেদ
বিচারপতি ওবায়দুল হাসান
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২০ | ১৫:৪৬
রবীন্দ্রসংগীত বিশেষজ্ঞ শান্তিনিকেতনের সংগীত ভবনের সাবেক অধ্যক্ষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠজন শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জন্মদিন আজ। আবার এ দিনটিতেই উপমহাদেশের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের তিরোধান দিবস বা তার মৃত্যুবার্ষিকী। তারা দু'জনই ছিলেন আমাদের অর্থাৎ নেত্রকোনাবাসীর আত্মার আত্মীয়।
শৈলজারঞ্জন মজুমদার ১৯০০ সালের ১৯ জুলাই মোহনগঞ্জের বাহাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈলজারঞ্জন মজুমদারের চারজন জ্ঞাতি কাকা শান্তিনিকেতনে পড়ালেখা করতেন। তাদের বেশভূষা, চলাফেরা, কথাবার্তা কিশোর শৈলজারঞ্জনের কাছে একটু অন্যরকম লাগত। তারা ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন। কলকাতার বাংলা ভাষায় কথা বলতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও ভক্তি দেখে শৈলজারঞ্জন কৈশোর থেকেই শান্তিনিকেতনের প্রতি আকৃষ্ট হন। আর তার এ আকর্ষণ ছিল কবিগুরুকে জানার ও তার সান্নিধ্যের প্রত্যাশায়। ১৯২১ সালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে শৈলজারঞ্জন প্রথম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দেখেন। সেদিনের এক বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করেছিলেন 'হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে' কবিতাটি।
শৈলজারঞ্জন মজুমদার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে প্রায়ই আসা-যাওয়া করতেন। ১৯৩২ সালের মাঝামাঝি সময়ে শৈলজারঞ্জন মজুমদার শান্তিনিকেতনে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। রবীন্দ্রনাথের আশ্রমে ছেলের অর্থকষ্ট হতে পারে তাই বাবা রমণী কিশোর দত্ত মজুমদার লোক মারফত ৩০০ টাকা পাঠিয়েছিলেন। বলেছিলেন, প্রেরিত টাকা ব্যাংকে রেখে প্রয়োজনমতো খরচ করতে। ওদিকে শৈলজারঞ্জন মজুমদার ক্রমেই কবিগুরুর কাছাকাছি আসতে থাকেন। ১৯৩৯ সালে শৈলজারঞ্জনকে কবিগুরু বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেন।
রবীন্দ্রনাথ একদিন শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে জিজ্ঞেস করলেন- 'কেউ যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করে তুমি শান্তিনিকেতনে কী করো? তবে কী বলবে?' শৈলজারঞ্জন বললেন- 'আমি অধ্যাপনা করি এ কথাই বলব।' রবীন্দ্রনাথ বললেন- 'অধ্যাপনা করো কী বিষয়ে বলবে?' শৈলজারঞ্জন বললেন- 'কেন কেমিস্ট্রি?' তখন রবীন্দ্রনাথ বললেন- 'না না দুটো মিশিয়ে বলবে।' শৈলজারঞ্জন জানতে চাইলেন- 'কার সঙ্গে কী মেশাবো?' রবীন্দ্রনাথ বললেন- 'হয় কেমিক্যাল মিউজিক নয়তো বলবে মিউজিক্যাল কেমিস্ট্রি।' রসবোধ ছাড়াও এর মধ্যে নিঃসন্দেহে একটা বার্তা ছিল।
নেত্রকোনার মানুষ হিসেবে বলতে গর্ব হচ্ছে যে, শৈলজারঞ্জন মজুমদারের উদ্যোগে ১৯৩৫ সালে শান্তিনিকেতন বা কলকাতার বাইরে নেত্রকোনাতেই প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপিত হয়েছিল। এই জয়ন্তীর একক উদ্যোক্তা ও সংগঠক ছিলেন বাবু শৈলজারঞ্জন মজুমদার। নেত্রকোনা বা ময়মনসিংহে রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনের খবরে বেশ খুশি হতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি নেত্রকোনা সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানতে চাইতেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন- 'তোমাদের নদীটির নাম যেন কী?' উত্তরে শৈলজারঞ্জন যখন নদীটির নাম বলতেন- 'মগরা' তখন কবিগুরু মগরা শব্দের অর্থ জানতে চেয়েছিলেন। 'মগরা' শব্দের অর্থ যে 'রাগী' এটি জানার পর আশ্চর্য হয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নেত্রকোনা আসেননি, ময়মনসিংহ এসেছিলেন। প্রশান্ত মহলানবিশ ও তার স্ত্রী নির্মল কুমারী মহলানবিশ কবিগুরুর কাছের মানুষ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন সময়ে এদের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। যে বাড়িটিতে মহলানবিশ দম্পতি বাস করতেন, সেটির নাম ছিল 'শশী ভিলা'। রবীন্দ্রনাথ ওই বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব দিকের ঘরটির নাম রেখেছিলেন 'নেত্রকোনা'।
মনে পড়ছে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে উদযাপিত হয়েছিল শৈলজারঞ্জন মজুমদারের ১১২তম জন্মদিন। অনুষ্ঠানটিতে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল প্রধান অতিথি হিসেবে। উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমাদের নেত্রকোনার আরেক কৃতীসন্তান কবি নির্মলেন্দু গুণ। এ অনুষ্ঠানে পশ্চিম বাংলা থেকেও বেশ কয়েকজন গুণী ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন। সে সময় তারা সবাই নেত্রকোনোর মোহনগঞ্জে আমাদের বাড়ি 'ছায়ানীড়ে' অবস্থান করেছিলেন। অনেক কথা বিনিময় হয় তাদের সঙ্গে।

সেই অনুষ্ঠান চলাকালেই নির্মলেন্দু গুণ বিষণ্ণ কণ্ঠে আমাকে বলেছিলেন- 'আজকেই হয়তো আমাদের একটি দুঃসংবাদ শুনতে হবে। সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদ আর বেঁচে নেই। তাকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।' মনে বিষাদের ছায়া নামল। বিকেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হলে আমি কিছুক্ষণ অবস্থান করে বাসায় চলে আসি। রাত সাড়ে ১০টা পৌনে ১১টার দিকে খবর আসে 'হুমায়ূন আহমেদ আর নেই'। দুঃসংবাদটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠান বন্ধ করা হয়। সাংস্টৃ্কতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত আয়োজকরা তাৎক্ষণিকভাবেই শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেন। শ্রদ্ধা জানান জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণে।
কথাসহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের দৌলতপুরে তার নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। হুমায়ূন আহমেদের জন্মস্থান এবং আমাদের বাড়ির দূরত্ব পাঁচশ' গজের মতো। হুমায়ূন আহমেদের মামারা আমাদের প্রতিবেশী। বয়সে হুমায়ূন আহমেদ আমার চেয়ে ১১-১২ বছরের বড় ছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পরদিন আমি ঢাকায় চলে আসি। পরে হুমায়ূন আহমেদের মায়ের সঙ্গে তাদের পল্লবীর বাসায় গিয়ে গভীর সমবেদনা জানাই।
কাকতালীয়ভাবে শৈলজারঞ্জন মজুমদার এবং হুমায়ূন আহমেদ দু'জনই পড়াশোনা করেছেন রসায়ন শাস্ত্র নিয়ে। তারা দু'জনই একই জেলার অধিবাসী এবং একই থানা এলাকা তাদের জন্মস্থান। উভয়েই রসায়ন শাস্ত্রের শিক্ষক ছিলেন। একজন ১৯২৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্যজন ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে এমএসসি করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের পৈতৃক নিবাসও নেত্রকোনার কেন্দুয়ার কুতুবপুর গ্রামে। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতবর্ষের বাঙালি অধ্যুষিত রাজ্য পশ্চিম বাংলা, আসাম ও আগরতলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছিল।
শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করার সুযোগ হয়েছিল। মনে আছে তিনি একবার বাংলাদেশে এসে মোহনগঞ্জে আমাদের বাসায় আমার বাবার আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। আর হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছিল। ঢাকা নিউমার্কেটের কাঁচাবাজারে। আমরা কিছুক্ষণ উভয়েই দাঁড়িয়ে মোহনগঞ্জে হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন স্মৃতির কথা আলাপ করছিলাম। মোহনগঞ্জ তথা নেত্রকোনার মানুষের দীর্ঘদিনের একটি দাবি ছিল শৈলজারঞ্জন মজুমদারের বাড়িটি যেন উদ্ধার করে তা সংরক্ষণ করা হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্থানীয় প্রশাসনকে এবং সংগীতপ্রিয় মানুষদের এ বিষয়ে উৎসাহিত করেছিলাম।
সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শৈলজারঞ্জন মজুমদারের স্মৃতি রক্ষার জন্য তার পৈতৃক ভিটায় শৈলজারঞ্জন সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছেন। স্থাপনাটি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক সচিব আমার ছোট ভাই সাজ্জাদুল হাসানের ভূমিকা মুখ্য। আমরা নেত্রকোনাবাসী আরও একটি দাবি জানাতে চাই- হুমায়ূন আহমেদের নামেও যেন নেত্রকোনায় একটি স্থাপনা প্রতিষ্ঠা হয়। এতে মানুষ যেমন শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে জানতে পারবে, ঠিক তেমনিভাবে আরও বেশি করে জানতে পারবে হুমায়ূন আহমেদকে।
শৈলজারঞ্জন মজুমদার এবং হুমায়ূন আহমেদের ধর্ম বিশ্বাস ভিন্ন হলেও তারা উভয়ই ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। তারা দু'জনই বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বিকাশে কাজ করে গেছেন জীবনভর। এ ধরনের মানুষের প্রয়াণেই তাদের সব কীর্তি হারিয়ে যায় না। শৈলজারঞ্জন মজুমদার ও হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে রইবেন তাদের কর্ম ও কীর্তির মাঝে। আজ শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জন্মদিবস ও হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুদিবসে বিনম্র চিত্তে স্মরণ করছি তাদের দু'জনকে।
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি
- বিষয় :
- স্মরণ
- বিচারপতি ওবায়দুল হাসান