শ্রদ্ধাঞ্জলি
বিনয়ী শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী
হাসান আজিজুল হক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২০ | ১৫:৪৬
আমরা কঠিন সময় অতিক্রম করছি। বলা যায় ক্রান্তিকালের ভেতর দিয়ে নানারকম শঙ্কা ও উৎকণ্ঠার মাঝে কাটছে আমাদের দিনরাত্রি। কখনও কখনও কারও কারও মনে হয়, অনেকের সঙ্গেই হয়তো শেষ দেখা হয়ে গেছে। শেষ বারের মতো কথাও হয়ে গেছে। কিন্তু না, আমরা এমন হতাশাকে কোনোভাবেই পুষ্ট হতে দেবো না, যদিও বাস্তবতা সে রকমই। চলমান করোনা-দুর্যোগকালে নানামুখী সংকটের ভয়াবহতা মানসিক স্বাস্থ্যেও যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে- এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। বিগত প্রায় পাঁচ মাসে করোনার গ্রাসে আমরা অনেক বরেণ্য রাজনীতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী, শিল্প-উদ্যোক্তা ও শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন স্তরের বহুজনকে হারিয়েছি। এই পরিস্থিতিতে আমাদের দিনরাত কাটছে আতঙ্ক-শঙ্কার মধ্য দিয়ে। শুক্রবার সকালে আরও একটি দুঃসংবাদ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ- মস্তিস্কে রক্তক্ষণজনিত কারণে বরেণ্য শিক্ষাবিদ, খ্যাতিমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদ রাজধানীর একটি হাসপাতালে মারা গেছেন।
এমাজউদ্দীন আহমদের খ্যাতির সীমানা অনেক বিস্তৃত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ ঐতিহ্যবাহী এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে ভূমিকা রেখে গেছেন, তা স্মরণযোগ্য হয়েই থাকবে। তার পাণ্ডিত্য ও প্রশাসনিক দক্ষতা দুই-ই প্রকাশ্যযোগ্য। তিনি বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু আমি নিজেই তার অনেক লেখায় দলের অনেক নেতিবাচক সিদ্ধান্তের সমালোচনা পত্রপত্রিকায় পড়েছি। সমকাল-এ তিনি নিয়মিতই লিখতেন। মাত্র ক'দিন এই পত্রিকায়ই 'করোনাকালে উপনির্বাচন' শিরোনামে তার একটি লেখা পড়েছিলাম। অত্যন্ত গঠনমূলক সমালোচনা ছিল ওই লেখার দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয়। তিনি একটি দলীয় ভাবাদর্শে বিশ্বাসী হয়েও তার লেখায় এই যে গঠনমূলক সমালোচনার সাক্ষ্য মিলত, এটাই ছিল তার অনন্য বৈশিষ্ট্য। এ কারণেই তিনি দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে ছিলেন গ্রহণীয়।
আমি নিজে একজন শিক্ষক হিসেবে তাকে যেভাবে মূল্যায়ন করব তা হলো- তিনি ছিলেন একজন আদর্শবান শিক্ষক। গবেষক হিসেবেও তিনি স্মরণযোগ্য তো বটেই। মানুষ তার কর্মের মাঝেই বেঁচে থাকে। তিনিও আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন তার কর্মখ্যাতির কারণেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রাজনীতি, গণতন্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে তার যেসব বিশ্নেষণ আমি পড়েছি, সে সবই আমার কাছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ মনে হয়েছে। স্পষ্ট দিকনির্দেশনার স্বাক্ষর রয়েছে তার বহু রচনায়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিনি জ্ঞান ও মূল্যবোধের আলো জ্বালিয়ে গেছেন অত্যন্ত সফলভাবে। প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় শিক্ষকতা জীবনে তিনি অনেক মানুষ গড়েছেন। তিনি আমার চেয়ে প্রায় ছয় বছরের বড়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন তার সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে কয়েকবার আলোচনা হয়েছে। এর আগেও কথা হয়েছে বহুবার। তার সবচেয়ে বড় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল বিনয়। এমন বিনয়ী, নিষ্ঠাবান মানুষেরাই তো সমাজে দ্যুতি ছড়ান, অন্যকে আলোকিত করেন নিজেদের আলোয়।
একুশে পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ এমাজউদ্দীন আহমদ গণতন্ত্র, রাজনীতি, রাষ্ট্রবিষয়ক অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন যা ভবিষ্যতের গবেষকদের কাছে অনেক সহায়ক হবে বলে মনে করি। তিনি ১৯৩৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাজশাহী অঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। সম্ভবত রাজশাহী কলেজে তিনি পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটি অ্যাট কিংসটন থেকে পিএইচডি করেন। আমাদের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতা হিসেবে একসময় কারাবাসও করেন। যতদূর জানি, দীর্ঘ প্রায় চার দশক তিনি তুলনামূলক রাজনীতি, প্রশাসন-ব্যবস্থা, বাংলাদেশের রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক বাহিনী নিয়েও ব্যাপক গবেষণামূলক কাজ করেছেন। দেশ-বিদেশের বহু জার্নালেও তার গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনার কথা জানি। সৃজনশীল-সৃষ্টিশীল এই মানুষটি সবকিছু ছাপিয়ে হয়ে উঠেছিলেন খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদান ও সৃজনশীল লেখার জন্য তিনি দেশ-বিদেশে বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন। মাত্র কয়েক মাস আগে সমকালে আমাদের বাতিঘর ড. আনিসুজ্জামানের চিরপ্রস্থানের পর তাকে নিয়ে কিছু লিখতে গিয়ে প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। কয়েক ধাপে সেই লেখাটি শেষ করেছিলাম। এই করোনাকালে আমরা অনেককেই হারিয়ে বেদনাকাতর হয়েছি। এই দুর্যোগের শেষ কোথায় তা আমরা কেউই জানি না। অনেক আপনজন-স্বজনকে হারিয়ে আমরা এই মহামারিকালে শোক-বেদনা প্রকাশেরও অবকাশ পাচ্ছি না। এমাজউদ্দীন আহমদের ক্ষেত্রেও এমনই ঘটেছে। একটি কথা নানা মহল থেকেই বহুবার শুনেছি- বিভিন্ন মতাদর্শ, ব্যক্তি এবং চিন্তাধারার সমালোচনা করলেও এমাজউদ্দীন আহমদ শেষ পর্যন্ত সবাইকে একত্রিত করার চেষ্টা করছেন। জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্যের ব্যাপারে তিনি যেমন ছিলেন উচ্চকণ্ঠ, তেমনি শেষ পর্যন্ত সবকিছুতেই ইতিবাচক দিকটিই দেখতেন।
বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক ছেদ করার তাগিদও তার লেখায়ই দেখতে পেয়েছি। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও টেকসই গণতন্ত্রের জন্য উচ্চকণ্ঠ এমাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও চেতনার কথাই বলেছেন নানা সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইস্যুতে। নিজে একটি রাজনৈতিক দলের আদর্শের অনুসারী হলেও অন্যান্য রাজনৈতিক মতাদর্শধারীকে তিনি শ্রদ্ধা ও সম্মানের দৃষ্টিতেই দেখতেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষক এই সৃজনশীল শিক্ষকের অনেক বই বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের পাঠ্যসূচিতেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ তার ব্যাপ্তি অনেকাংশ জুড়ে। ভিন্ন মতাদর্শের মানুষদের প্রতি এমাজউদ্দীন আহমদের অগাধ শ্রদ্ধা তার চরিত্রের মহত্ত্বের দিকটিই বড় করে তুলেছিল। তিনি ভিন্ন মতের সমালোচনা করতেন বটে কিন্তু তা উড়িয়ে দিতেন না। এই চিন্তাধারা তো গণতন্ত্রের সংজ্ঞাসূত্র মোতাবেক সমাদৃত হতে বাধ্য।
তিনি সব সময় চেয়েছেন বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে উঠুক। তার চিন্তা-চেতনায় এরই ছাপ পরিলক্ষিত হয়েছে। তিন মেয়াদের ধারাবাহিক এ সরকারের আমলে উন্নয়ন-অগ্রগতির নানা চিত্রও তার লেখায় উঠে এসেছিল। অর্থাৎ তিনি বিরোধিতার জন্যই শুধু বিরোধিতা করতেন না। যুক্তি, গঠনমূলক সমালোচনা, বিকশিত গণতন্ত্র, উদার চিন্তার ধারক-বাহক এমাজউদ্দীন আহমদ কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিএনপিরও সমালোচনা করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি অগ্রজকে।
কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি
- হাসান আজিজুল হক