ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

আজকের মানস-ভূমি

আজকের মানস-ভূমি
×

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২০ | ১৫:৪৭

সম্প্রতি বাংলাদেশের বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের একটি অনলাইন গোলটেবিল বসেছিল। উদ্যোক্তা ছিল 'মনের খবর' বলে একটি মনোচিকিৎসার পত্রিকা। করোনাকালের মানসিক সমস্যা নিয়ে এই গোলটেবিলে বিশেষজ্ঞগণ একটি কেস স্টাডি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। ওই গোলটেবিলে হংস মাঝে বক যথা এই অভাজনকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আলোচনায় করোনাকালে উদ্ভূত মানসিক চাপ এবং করণীয় বিষয়গুলোতে বিশেষজ্ঞগণ তাদের মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। এর মধ্যে উঠে এলো মিডিয়ার বিষয়গুলো। মিডিয়াতে করোনা একটি প্যানিক সৃষ্টি করে ফেলেছে।

আমি বহুদিন ধরেই মিডিয়াতে অল্পবিস্তর কাজ করি। এ ছাড়াও আমি একজন সংবাদপ্রেমী বটে। বাংলাদেশের সবগুলো চ্যানেল টিপতে টিপতে বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা, এনডিটিভিতে চলে যাই। বাড়িতে এই নিয়ে অশান্তি। এ জন্য আমার স্টাডি রুমে একটা টেলিভিশন সেট বসিয়েছি। সারাবিশ্বের ইলেকট্রনিক সংবাদ মাধ্যমের মধ্যে একটা ঐক্য আছে। অধিকাংশ স্টেশনে এখন উচ্চ শিক্ষিত সাংবাদিকতার ছাত্ররা আছেন। সংবাদের অধিকাংশ তত্ত্ব একই জায়গা থেকে আসে বলে তাদের বিস্তারও ঐক্য আছে। এ দেশে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আধুনিক সাংবাদিকতা এনেছিল একুশে টিভি। সেখান থেকেই সাংবাদিকরা বিভিন্ন স্টেশনে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাই রিপোর্টারদের মেধার তারতম্য থাকলেও বিবিসি, সিএনএন, এনডিটিভির মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। তবে রিপোর্টারদের মেধার তারতম্য ব্যাপক। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। অনেক বাস্তব কারণে তা সম্ভবও নয়। বিশেষ করে সংবাদের চ্যানেলগুলো খুবই খরচসাপেক্ষ হলেও আয় কম। তবুও এই চ্যানেলগুলোর কারণে অনেক বড় বড় ঘটনা প্রচার হয়েছে। বাংলা ভাই গ্রেপ্তারে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ বিভিন্ন অপরাধীদের বিচারের জন্যও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সংবাদের প্রাচীন তত্ত্বগুলোর কোনো পরিবর্তন হয়নি। দুঃসংবাদই সংবাদ, সুসংবাদ সংবাদ নয়- এই তত্ত্বটি এখনও রয়েছে। কুকুর মানুষকে কামড় দিয়েছে, সেটি সংবাদ নয়; কিন্তু মানুষ যদি কুকুরকে কামড় দেয় সেটিই সংবাদ। একটি চ্যানেলে দেখছিলাম মৃত্যু সংবাদগুলোর ভিজুয়াল হিসেবে কবরস্থানকে দেখানো হচ্ছে। এক সময় খুনের সংবাদ দিতে গিয়ে রক্ত পর্যন্ত দেখানো হয়েছে, এখন অবশ্য দেখিনি।


আমাদের দেশে অবশ্য প্রকাশ্যে গরু-খাসি জবাই করা হয়। কোরবানির সময় এই জবাই দেখে শিশু-কিশোররাও এক ধরনের আনন্দ পায়। সেই আনন্দ কালক্রমে ওই শিশুর মানসগ্রন্থিতে এক ধরনের নেতিবাচক ছাপ ফেলে থাকে। যাই হোক, সাংবাদিকতা যথার্থই একটি সৃজনশীল মাধ্যম, ইংরজিতে বলা হয় লিটারেচার ইন অ্য হারি, তেমনি সংবাদ পরিবেশনাও এক ধরনের দ্রুত সুচিন্তিত উপস্থাপনা। এবারে মূল কথায় আসি। সংবাদ বস্তুনিষ্ঠ হয় সেটি সত্য। এ সত্যের থেকে ব্যত্যয় করা যাবে না। কিন্তু পাশাপাশি খুঁজে বের করতে হবে কোথায় আশাজাগানির আরেকটি সংবাদ আছে। করোনায় মৃত্যু হচ্ছে এটি সত্য, ভয়ংকর সত্য কিন্তু অনেকেই আবার বেঁচেও আসছে। এই যে বিশাল বাঁচার গল্প সেটিও জানাতে হবে। এর পেছনে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকার কথাও আমরা জানতে চাইব। দুঃখও কখনও বিনোদন হয়। 'আওয়ার সুইটেস্ট সঙস আর দোজ দ্যাট টেল দ্য স্যাডেস্ট থট।' বর্তমান পরিস্থিতি শ্বাসরুদ্ধকর। যেন জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আমরা দাঁড়িয়ে। এ অবস্থায় মানুষ জানালা চাইবে, সে জানালা হচ্ছে কিছু সুসংবাদ। এ নিয়ে নিশ্চয়ই সাংবাদিকরা ভাবছেন। ভাবনাটি ত্বরান্বিত হলেই মঙ্গল। দ্বিতীয়টি একটি সুসংবাদ, আজ ভোরে সাহেদ করিম ধরা পড়েছে, ধরা পড়েছে সাতক্ষীরার দেবহাটায় ইছামতির পাড়ে একটি নৌকায়। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতা কত বড় আরেকটু দেরি হলেই ইছামতি পাড় হলেই বশিরহাট, সেখান থেকে কলকাতা খুবই কাছে। বিভিন্ন চ্যানেলে সকাল থেকেই এ সংবাদ দেখে আসছি। সাহেদ করিমকে দেখা যাচ্ছে বহু র‌্যাবের অফিসার পরিবৃত হয়ে সাংবাদিকদের সংবাদ নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, সাহেদ করিম কি আজই অন্য গ্রহ থেকে এই গ্রহে আবির্ভূত হলেন? এতদিন কোথায় ছিলেন? এত দুর্নীতি, এত প্রতারণা, এত মামলা মাথায় নিয়ে টেলিভিশনের টক শো (এ বিষয়ে বড় বড় কথা কি করে বললেন?) মনে পড়ে শিখ ধর্মীয় নেতা ভিন্দালওয়ালাকে স্বর্ণমন্দির থেকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেন তদানিন্তন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। বিপুল অস্ত্র নিয়ে ভিন্দালওয়ালা গ্রেপ্তার প্রতিরোধের চেষ্টা চালান। অবশেষে তিনি নিহত হন। স্বর্ণমন্দির অধিকৃত হওয়ার পর বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হয়। এই নিয়ে সে সময়ে একটা বিরাট প্রশ্ন সারা ভারতে ঘুরপাক খাচ্ছিল- তাহলো এত অস্ত্র স্বর্ণমন্দিরে জমা হলো কী করে? একদিনে তো সম্ভব নয়, বহুদিন ধরে এই অবৈধ অস্ত্রগুলো জমা হলো কী করে? সে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। আজও এ প্রশ্ন সর্বত্র জাগবে, কী করে সাহেদ করিমের উত্থান হলো? এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের বা সরকারের অগোচরে এসব ঘটেনি। টিভিতে টকশোতে সে কোন পরিচয়ে প্রবেশ করল এবং কার সাহায্যে। স্বাস্থ্য সচিব তার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করল কোন তদবিরে? মন্ত্রী আজ বলছেন অনেক চুক্তিই স্বাক্ষর হয় তিনি কিছুই জানতেন না। শুধু সাহেদ করিম নন, অনেক সাহেদের অভয়ারণ্য হয়ে যায় আমাদের মাতৃভূমি। সম্প্রতি সিকদার গ্রুপের মালিকের দুই ছেলে একটি অ্যাম্বুলেস বিমানে দেশ থেকে পালিয়ে যান কী করে? আমাদের এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ কি এর জবাব দিতে পারবেন? সেই সঙ্গে বিপুল অর্থের কথা এনেছে, তাও কি মাত্র কয়েকদিনের বিষয়? পাপুল যে অর্থের মালিক হয়েছেন তাতে কুয়েতের আমাদের দূতাবাস কি অবগত নন? সেখানে গোয়েন্দা নজরদারিরও ব্যবস্থা আছে। তারাই বা কী করেন? এরাই শুধু নয়, দেশে লাখ লাখ প্রতারক বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতার আড়ালে দুর্নীতি, প্রতারণা এবং লুণ্ঠনের কাজ করে যাচ্ছে। সাহেদ ধরা পড়েছে, ওরা ধরা পড়েনি।

মাঝে মাঝেই সংবাদে দেখতে পাই পুলিশ মামলা নেয়নি। কার নির্দেশে পুলিশ মামলা নেয়নি? আধুনিক পুলিশের কথা বলা হচ্ছে, যে পুলিশ নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দেবে, সেই পুলিশ মামলা পর্যন্ত নেয় না। তাহলে জননিরাপত্তা কোথায়? আসলে নিরাপত্তার বিষয়টিও এক ধরনের ক্ষমতার কাছে ন্যস্ত আছে। পুলিশ আগের মতোই ক্ষমতাবানদের কাছে বন্দি। আমি একবার সানফ্রান্সিসকোর সীমান্তবর্তী একটা ছোট্ট শহরে গিয়েছিলাম। সেই শহরে কোনো পুলিশ নেই। সেখানকার বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে জানাল আমাদের ট্যাক্স দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই, কারণ জনসংখ্যা কম। আবার প্রশ্ন করলাম, তোমাদের সমস্যা হয় না? সে জানাল, এখনও সমস্যা হয়নি, কারণ আমরা নাগরিকরা এখানে খুবই ঐক্যবদ্ধ অন্যায় ও বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে। এখানে ওই ধরনের মানুষ সুবিধা করতে পারে না। আমেরিকার বড় বড় শহরে এত পুলিশ, কিন্তু সেখানে অপরাধও বেশি। তাই পুলিশ ছাড়া আমরা এখনও ভালোই আছি। এসব ঘটনা দৃষ্টে মনে হয় নাগরিক সম্পৃক্ততা ছাড়া এসব অপরাধ বন্ধ হবে না। পুলিশকে এসব নাগরিক উদ্যোগকে পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা সর্বতোভাবে সাহায্য করবে এবং নাগরিকদেরও কর্তব্য হবে পুলিশকে তার কর্তব্যেও সাহায্য করতে হবে। যদিও পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় গণপ্রতিনিধিদেরও এসব কাজে সম্পৃক্ত হতে হয়, নিজেদের ক্ষমতার বলয় বাড়াতে হয়। করোনা এখন সারাদেশে একটা অদৃশ্য শত্রু। এসব অপরাধী দৃশ্যমান শত্রু। এ দৃশ্যমান গণশত্রুদের বিনাশ না করলে দুর্নীতির এক অভয়ারণ্যে পরিণত হবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, যার প্রতিটি ধূলিকণায় শহীদের রক্ত মিশে আছে।

নাট্যব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×