ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

সিলেট নগরী

জল নয়, শুধু অর্থ নিস্কাশন?

জল নয়, শুধু অর্থ নিস্কাশন?
×

ছবি: ফাইল

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২০ | ১৫:৪৭

ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর সিলেট মহানগরীতেও জলাবদ্ধতার খবর আমাদের যতখানি না হতাশ, তারচেয়ে বেশি করেছে হতবাক। রাজধানী শহর ঢাকা যদিও প্রাকৃতিকভাবেই অর্ধশতাধিক খাল ও নদীবেষ্টিত ছিল, এর বেশিরভাগই দখল, ভরাট ও দূষণের শিকার হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়নের জের ধরে বেশিরভাগ নিম্নভূমিও ভরাট করে ফেলেছে আবাসন কোম্পানিগুলো। ফলে অতিরিক্ত বর্ষণের পানি সহজে নামতে পারে না। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি- ঢাকার মতো নদী, খাল, ভরাট ও দখল ছাড়াও বাড়তি কারণ হচ্ছে জোয়ার-ভাটার প্রভাব বৃদ্ধি। জোয়ারের সময় অতিরিক্ত বর্ষণের কারণে পনি নিস্কাশন ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে বৈকি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বেড়িবাঁধ ব্যবস্থার 'পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া' হিসেবে উপকূলীয় কোনো কোনো শহরেও সাম্প্রতিক সময়ে জলাবদ্ধতা দেখছি আমরা। কিন্তু জলাবদ্ধতায় নাকাল নগরের তালিকায় সিলেট কী কারণে যুক্ত হয়েছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। শনিবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাতে সিলেট নগরীর অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এমনকি আগে কখনও জলাবদ্ধতার শিকার হয়নি, এমন এলাকাও এবার জলমগ্ন।

আমরা জানি, ভৌগোলিকভাবে হাওরাঞ্চলে অবস্থিত হলেও সিলেট শহর 'নিম্নভূমি' নয়। বরং টিলাবহুল এই নগরী ওই অঞ্চলের অন্যতম উচ্চভূমি। ঢালু ভূ-গঠন ও শহরের পাদদেশে প্রবহমান সুরমা নদীর কারণে সিলেট নগরীতে আর যে নাগরিক সংকটই থাকুক, জলাবদ্ধতা থাকার কথা নয়। দুর্ভাগ্যবশত সেই চিত্রই আমাদের দেখতে হচ্ছে। অথচ সিলেট যেমন ভৌগোলিকভাবে ঢাকার মতো সমতল নয় যে, বৃষ্টির পানি আটকে থাকতে পারে; তেমনই চট্টগ্রামের মতো সমুদ্রসংলগ্নও নয় যে, জোয়ারের প্রভাবে বৃষ্টির পানি নামতে বিলম্ব হতে পারে। কিন্তু তারপরও জলাবদ্ধতা হচ্ছে কেন? এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই যে, সমস্যা পানি নিস্কাশন ব্যবস্থায়। গত দুই দশকে সিলেট শহরের প্রাকৃতিক ছড়াগুলো যেমন, তেমনই কৃত্রিম নালাগুলোও দখল ও ভরাটের শিকার হয়েছে। ফলে পানি সহজে নামতে পারে না। ঢাকা বা চট্টগ্রামের তুলনায় সিলেটের পানি নিস্কাশন সমস্যা দূর করা অপেক্ষাকৃত 'সহজ'। শুধু যদি ছড়া ও নালাগুলো প্রতিবন্ধকতামুক্ত রাখা যায়, তাহলেই পরিস্থিতির বহুলাংশে উন্নতি ঘটবে। আমরা দেখছি, এ ব্যাপারে সরকারের দিক থেকে কোনো ঔদাসীন্য নেই। প্রকল্প ছাড় ও অর্থ বরাদ্দ হয়েছে দফায় দফায়। গত বছর সিলেট নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতে 'রেকর্ড' ১২শ' ২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

২০১৬ সালেও এই খাতে ২৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সমকালের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যাচ্ছে, অপেক্ষাকৃত কম হলেও বরাদ্দ এসেছিল ২০১৩ এবং তারও আগে ২০০৯ সালে। আমাদের প্রশ্ন- নালা, খাল, ছড়া যদি উদ্ধার না-ই হয়, তাহলে এত অর্থ যাচ্ছে কোথায়? নগরের প্রাকৃতিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখলেই যেখানে পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা সচল থাকার কথা, সেখানে শত শত কোটি টাকা খরচ করেও বছরের পর বছর কেবল জলাবদ্ধতাই সম্প্রসারিত হবে কেন? তার মানে এত প্রকল্প ও বরাদ্দ দিয়ে পানি নয়, অর্থ নিস্কাশনেরই ব্যবস্থা করা হচ্ছে? আমরা দেখতে চাই, অবিলম্বে চলমান প্রকল্পের মান ও অগ্রগতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অতীতে বিভিন্ন দফায় বরাদ্দ অর্থ কোন নালা দিয়ে 'জলে গেছে' তাও নিরীক্ষা প্রয়োজন বর্তমান ও ভবিষ্যতের অর্থ কাজে লাগার স্বার্থেই। আমাদের মনে আছে, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পেয়ে সিলেট নগরীর মেয়র সরকারকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন। মেয়রের এ কথাও আমরা ভুলিনি যে- প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে খাল ও ছড়া কেবল উদ্ধারই নয়, অভ্যন্তরীণভাবে নৌকা চলাচলও সম্ভব হবে। এখন দেখা যাচ্ছে, জলাবদ্ধতার কারণে খালের বদলে সড়কে নৌকা চালাতে হবে নগরবাসীকে। আমরা বাগাড়ম্বর চাই না, কাজ দেখতে চাই। সিলেট নগরীর খালে নৌকা চালানোর স্বপ্ন নিশ্চয়ই সাধুবাদযোগ্য; কিন্তু তার আগে খোদ খাল ও ছড়া সচল হোক। আপাতত জলপথ চাই না, জলাবদ্ধতা সামলান।

আরও পড়ুন

×