ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

উচ্চশিক্ষায় অস্বচ্ছ নিয়োগ-পদোন্নতির প্রভাব

উচ্চশিক্ষায় অস্বচ্ছ নিয়োগ-পদোন্নতির প্রভাব
×

ড. এবিএম রেজাউল করিম ফকির

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রচলিত প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার অন্ত নেই। ২০১৮ সালের ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তার ওয়েবসাইটে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি, পদোন্নয়ন অভিন্ন নীতিমালা শীর্ষক একটি দলিল প্রকাশ করে। এই নীতিমালাটি প্রকাশিত হওয়ার পর শিক্ষকদের একটি অংশ ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমাজে এই নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও পর্যালোচনা। যদিও করোনা মহামারির বিস্তৃতির কারণে এই আলোচনা স্তিমিত হলেও ভেতরে ভেতরে পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
শিক্ষকদের পদোন্নতির ব্যাপারটি যদি অস্বচ্ছ অথবা দোষযুক্ত হয়, তাহলে শুধু যে শিক্ষক সমাজই ভোগান্তির শিকার হবে তা নয়, বরং সারাজাতিই ভোগান্তির শিকার হবে। শিক্ষক পদোন্নতির নীতিমালা এমন হওয়া উচিত নয় যে, সেই নীতিমালার ফাঁকফোকরে যে কেউ অধ্যাপক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবেন। কারণ একজন অধ্যাপক একটি প্রতিষ্ঠান, একটি জাতির পথপ্রদর্শক ও সর্বোপরি আলোকবর্তিকাবিশেষ। কিন্তু পদোন্নতির নীতিমালার শৈথিল্যের কারণে যদি কেউ অধ্যাপক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং তার জ্ঞানদীপ্তির মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে; তখন বুঝতে হবে একজন আমলা অথবা একজন খেটে খাওয়া সাধারণ নাগরিক শুধু একজন অধ্যাপকের মর্যাদা, ক্ষমতা ও পারিতোষিক নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন তা নয়, বরং তিনি একটি জাতির বিবেককেই প্রশ্ন করছেন এবং একটি বিশৃঙ্খল উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কেই প্রশ্ন তুলছেন।
শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে যে নীতিমালা বিদ্যমান রয়েছে, তা সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতিতে সহায়ক নয়। কারণ এই নীতিমালা পাশ কাটানোর নানা কৌশল রয়েছে, যাকে আমরা নিয়োগ-পদোন্নতি প্রকৌশল বলে অভিহিত করতে পারি। এই নিয়োগ-পদোন্নতি প্রকৌশলটি হলো মূলত নিয়োগ-পদোন্নতির শর্ত, যেমন প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও প্রকাশনা ফাঁকি দেওয়ার অপকৌশল বিশেষ। এই নিয়োগ-পদোন্নতি প্রকৌশল নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে যেভাবে কাজে লাগানো হয়, তা হলো প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের প্রভাব খাটিয়ে ও ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষা পদ্ধতির ব্যবহার করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। আর নিয়োগ-পদোন্নতি প্রকৌশল পদোন্নতির ক্ষেত্রে তিনভাবে কাজে লাগানো হয়। প্রথমটি হলো- শূন্য পদ ব্যবহার করে অযোগ্য ব্যক্তিকে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা। এই পদ্ধতিতে কোনো পদ শূন্য হলে প্রয়োজনীয় প্রকাশনা না থাকলেও ঈপ্সিত ব্যক্তিকে সে পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া হয়। দ্বিতীয়টি হলো- প্রশাসনিক পদের অভিজ্ঞতাকে প্রকাশনার সমান গুরুত্ব দেওয়া। আর তৃতীয় পদ্ধতিটি হলো- প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অথবা কুম্ভিলক বৃত্তির মাধ্যমে প্রকাশনা তৈরি করা এবং সেই মানহীন প্রকাশনাকে নিয়োগ ও পদোন্নতির কাজে ব্যবহার করা।
নিয়োগ-পদোন্নতি প্রকৌশল খাটিয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষকরা জ্ঞানচর্চা রাজ্যে, তাদের মতো করে ইতোমধ্যে একটি রেওয়াজ চালু করেছে। এবং তাদের এই জ্ঞানান্ধতা ও অর্বাচীনতার প্রভাব এখন ব্যক্তি পর্যায়ে, শিক্ষাঙ্গনে, জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ও বৃহত্তর জাতীয় পর্যায়ে নানা দৃশ্যপটে প্রতিফলিত হচ্ছে। তারা জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় ব্যাপৃত শিক্ষকদের মধ্যে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে তাদের প্রাধান্য বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকে এবং প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত হতে আগ্রহী থাকে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চার বিষয়টি পাশ কাটাতে চেষ্টা করে। তার প্রতিফলন দেখা যায় তাদের লেখায়। তাদের লেখায় কতকগুলো ত্রুটি ধরা পড়ে। একটি গবেষণা সন্দর্ভের ভাষা ও গঠন সাধারণের জন্য লেখা নিবন্ধের চেয়ে ভিন্নতর হয়, কারণ এতে শাস্ত্রীয় জ্ঞানের পরিভাষা ব্যবহার করা হয় এবং এতে গবেষণার লক্ষ্য, কল্পানুমান, পদ্ধতি, তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ ও উপসংহার ইত্যাদি অংশ সন্নিবেশিত থাকে।
পদোন্নতি প্রকৌশলের সৃষ্টি জ্ঞানান্ধতার এই প্রতিফলন জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও পরিদৃষ্ট হতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। দেশের মানুষের কাছে সেসব জাতীয় প্রতিষ্ঠান আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে এসব প্রতিষ্ঠানকে একটি সাধারণ অফিস ঘরের বাইরে আর কিছু মনে হয় না। এ ধরনের জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ, পরামাণু শক্তি কমিশন, বাংলা একাডেমি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। এসব অফিসে গেলে মনে হয় নির্জীব এক জগতে প্রবেশ করেছি। কিন্তু উন্নত দেশে এ ধরনের জাতীয় প্রতিষ্ঠানে জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা ও পর্যালোচনা হয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন দেখানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোয় এই যে নির্জীব অবস্থা বিরাজিত, তা মূলত বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় যে জ্ঞানান্ধতার আবহ তৈরি করা হয়েছে তারই প্রতিফলন বিশেষ।
শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপর্যয় রোধে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়াটি এমন স্বচ্ছ হওয়া উচিত যেন, শুধু মেধাবী, অধ্যবসায়ী ও জ্ঞানদীপ্ত শিক্ষকরাই পদোন্নতি পান। আর কোনো কারণে নীতিমালা পাশ কাটিয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতিপ্রাপ্তরা ধরা পড়লে যেন পদ অবনমনের মতো শাস্তি পান। সে জন্য স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার করে অধ্যাপক বানানোর প্রক্রিয়াটিকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। আর তা করতে হলে, নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হলে নিয়োগ বা পদোন্নতির বিষয়টি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পর্যায়ে নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা প্রয়োজন। বর্তমানে স্বায়ত্তশাসনকে অপব্যবহার করে নিয়োগ-পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা শিক্ষা প্রশাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তারা এখন নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখতে সচেষ্ট। আর যারা জ্ঞানান্বেষণী ও আলোকিত শিক্ষক, তারা জ্ঞানচর্চা-গবেষণায় আগ্রহী; তারা নিজেরা যেমন জ্ঞানদীপ্ত হয়ে উঠতে সর্বদা সচেষ্ট, তেমনিভাবে শিক্ষার্থীদেরও জ্ঞানদীপ্ত হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট থাকেন। কিন্তু এই ঘরানার শিক্ষকরা শিক্ষা প্রশাসনের কাছে জিম্মি থাকেন। তারা তাদের অধ্যবসায়ের ফসল থেকে বঞ্চিত হন। তারা শিক্ষা প্রশাসন থেকে যেমন মূল্যায়ন পান না, তেমনি সরকারের কাছ থেকেও কোনো মূল্যায়ন পান না। কারণ জ্ঞানবিমুখ শিক্ষা প্রশাসন তাদের গুরুত্ব সরকারের
কাছে পৌঁছাতে দেয় না। ফলে শিক্ষা-গবেষণায় অধিকতর অবদান রেখেও তারা প্রশাসনে অধিষ্ঠিত অযোগ্য শিক্ষকদের সমান মর্যাদা, ক্ষমতা ও পারিতোষিক পান না।
উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে এখান থেকে উঠে দাঁড়াতে হলে, শুধু নীতিমালা দিয়ে এখন আর কিছু হবে না। এখন প্রয়োজন বৈপল্গবিক পরিবর্তন। আর বৈপ্লবিক পরিবর্তন সংঘটিত করতে প্রয়োজন জ্ঞানদীপ্ত অধ্যাপকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি পর্ষদ। বাংলাদেশে বিরাজিত বর্তমান উচ্চশিক্ষা প্রশ্রয় দিয়ে দেশ ও জাতি কোনোভাবেই এগোতে পারবে না। সে জন্য এই ব্যবস্থার সংস্কার ও উন্নয়ন করা প্রয়োজন। আর প্রয়োজন জ্ঞানদীপ্ত অধ্যাপকদের প্রয়াস ও জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব।
অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×