ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

যোগাযোগ

নৌপথে দুর্ঘটনা রোধে আরও উদ্যোগ দরকার

নৌপথে দুর্ঘটনা রোধে আরও উদ্যোগ দরকার
×

সালাহ্‌উদ্দিন নাগরী

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২০ | ১৫:৫১

সড়ক, রেল ও জলপথে আমাদের দেশে যত দুর্ঘটনা ঘটে ও জানমালের ক্ষতি হয়, তার সিংহভাগ সংশ্নিষ্টদের খামখেয়ালিপনা ও অসতর্কতার কারণে হয়ে থাকে। গত ২৯ জুন সকালের লঞ্চডুবি সে ইঙ্গিতই বহন করে। দৈনিক সমকালের ৩০ তারিখের প্রতিবেদন মতে, ওই দিন সকালে মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা লঞ্চ মর্নিং বার্ড ফরাশগঞ্জ ঘাটে যখন ভেড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক ওই সময় ঢাকা-চাঁদপুর রুটে চলাচলকারী ময়ূর-২ নামের আরেকটি লঞ্চ পেছন থেকে সেটিকে সজোরে ধাক্কা দিলে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেটি ডুবে যায়। এতে ৩৪ যাত্রীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু এবং দুই লঞ্চের সার্ভে সনদ ও রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করেছে নৌপরিবহন অধিদপ্তর।

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি বড় দুর্ঘটনা থেকে সহস্রাধিক যাত্রী অল্পের জন্য জানে বেঁচে গেছে। এখানেও সেই একই ভুল ও অসতর্কতাই ছিল মূল কারণ। ৬ জুলাই যাত্রী নিয়ে ঢাকা-কালাইয়া রুটে চলাচলকারী বন্ধন-৫ ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় আর গলাচিপা থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে পূবালী-৫। রাত ২টার দিকে মেঘনা নদীর মিয়ারচর চ্যানেল অতিক্রম করার সময় লঞ্চ দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ সময় দুই লঞ্চে সহস্রাধিক যাত্রী ছিল।

গত বছরের জানুয়ারিতে গভীর রাতে মুন্সীগঞ্জের মেঘনা নদীতে একটি তেল বোঝাই কার্গোর সঙ্গে ধাক্কা লেগে একটি ট্রলার ডুবে যায়। মাটিবোঝাই ওই ট্রলারটিতে ৩৪ শ্রমিক ছিলেন। তাদের কেউ কেউ সাঁতরে তীরে আসতে পারলেও অনেকেই নিখোঁজ ছিলেন। এ ধরনের ছোট-বড় দুর্ঘটনা প্রায়শই ঘটছে।

নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের ভাষ্য মতে, পরিসংখ্যান ও ধরন অনুযায়ী শুধু সংঘর্ষে ৪২ দশমিক ৭০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল বোঝাইয়ের কারণে ২৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ২৩ দশমিক ১৭ শতাংশ, অগ্নিকাণ্ড ও বিস্টেম্ফারণে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং অন্যসব কারণে ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২৯ বছরে ৫৭০টি দুর্ঘটনায় তিন হাজার ৬৫৪ জনের মৃত্যু ঘটে, আহত ও নিখোঁজ হয় যথাক্রমে ৫১৬ ও ৪৮৯ জন।

কেন এ ধরনের দুর্ঘটনা নিয়মিত ঘটে চলেছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নৌযানগুলোর ত্রুটি ও যান চালনায় জড়িতদের অদক্ষতা, অসতর্কতা, অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল পরিবহনের জন্য প্রধানত দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। বহু নৌযান নির্মাণ ও নকশার ত্রুটি এবং সার্ভে সার্টিফিকেট ছাড়াই চলাচল করছে। ফলে সামান্য এদিক-ওদিক হলেই ভারসাম্য রাখতে না পেরে ডুবে যাচ্ছে। কিছু ট্রলারের রাতে চলাচলে বিধি-নিষেধ আছে কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। রং সাইডে চলাচল, অনিয়ন্ত্রিত গতি, ট্রাফিক ব্যবস্থাকে উপেক্ষা, অভিজ্ঞ মাস্টার-ড্রাইভার ছাড়া শুধু সুকানি দিয়ে নৌযানগুলো চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে।

আমাদের দেশে স্পিডবোট চালকের অদক্ষতা ও খামখেয়ালিপনায় এ বাহনটিও প্রায়শই দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। বছর দু'য়েক আগে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটে মাঝ পদ্মায় ২০ যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোট ডুবে যায়। দেশের যেসব জায়গায় স্পিডবোট চলে তার কোথাও না কোথাও থেকে দুর্ঘটনার খবর মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখতে পাওয়া যায়। উল্লিখিত এ চালু রুটের দু'পারের ঘাটে সবসময় শতাধিক স্পিডবোট সকাল-সন্ধ্যা যাত্রী পারাপার করছে। এ ছাড়া বৃহত্তর বরিশাল, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে স্পিডবোট চলাচল করছে। যেসব জায়গায় স্পিডবোট চলাচল করছে, যাত্রী ওঠানামা করার জন্য কোথাও সুনির্দিষ্ট কোনো প্ল্যাটর্ফম নেই। ঘাটে বাঁধা নৌকার ওপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠানামা করতে হয়। এতে ছোট শিশু, নারী-পুরুষ সবারই অসুবিধা হচ্ছে, পানিতে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকছে। এসব বোট চালকের দক্ষতা পরিমাপ ও লাইসেন্সে প্রদানের ব্যবস্থা এবং সুনির্দিষ্ট ও পদ্ধতিগত কোনো প্রশিক্ষণ নেই। চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং লাইসেন্সিংয়ের আওতায় আনতে হবে। চালক ও সেকেন্ড সিটারসহ দু'জনের বাহন মোটরসাইকেল চালাতে যদি চালকের লাইসেন্স নিতে হয়, বিআরটিএ থেকে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হয়, তা হলে ১৫-২০ যাত্রী নিয়ে যে বাহনটি উত্তাল নদী পাড়ি দেয়, সেটিকেও নূ্যনতম কিছু শর্ত পালনের আওতায় আনতে হবে।

লঞ্চঘাটে নৌকা, স্পিডবোট ও লঞ্চে উঠতে-নামতে অনেকেরই পানিতে পড়ে যাওয়া, আহত ও ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে, যাত্রীদের মাত্র দু-আড়াই ফুট চওড়া কাঠের পাটাতন দিয়ে হেঁটে নৌকা বা লঞ্চে ওঠা-নামা করতে হয়। নৌকা, লঞ্চ, স্পিডবোটের জন্য আলাদা, টার্মিনাল, প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। জলযানে ওঠা-নামার বিপদ ও দুঃসহ বিড়ম্বনা থেকে যাত্রীদের রেহাই দিতে হবে। নৌ-দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটিগুলো কর্তৃক যে মতামত দেওয়া হয়, তা বিশ্নেষণপূর্বক ভুলত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে তা সংশোধন এবং অনুসরণের উদ্যোগ সারা বছর জারি রাখতে হবে।

গত ২৯ জুনের দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া একাধিক যাত্রী ও তাদের স্বজনরা বলেছেন- ঝড়, ঢেউ বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক কারণে দুর্ঘটনার শিকার হলে মনকে একধরণের প্রবোধ দেওয়া যায়; কিন্তু চালকের গাফিলতির জন্য এতগুলো প্রাণ শেষ হয়ে যাবে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ ধরনের অনুভূতিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে জলপথের আমাদের সব আয়োজন সাজাতে হবে।

উপপরিচালক, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর
[email protected]


আরও পড়ুন

×