জন্মদিন
রাজনীতির নৈতিক মানুষ তাজউদ্দীন আহমদ
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২০ | ১৫:৫১
যে যুগে রাজনীতির সঙ্গে নৈতিকতার গভীরতর যোগাযোগ ছিল, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫-১৯৭৫) সেই কালের হাওয়ায় বেড়ে ওঠা মানুষ। অনৈতিকতা রাজনীতিতে তখনও ছিল; কিন্তু নৈতিকতাকে সেকালে শক্তি ভাবা হতো। ফলে রাজনীতিতে নৈতিকতাকে যারা আদর্শ ভাবতেন, তারা তখনও সংখ্যালঘু হয়ে ওঠেননি। আজকের দিনে রাষ্ট্র-রাজনীতিতে অনৈতিকতার যে পৃষ্ঠপোষকতা, তাজউদ্দীন আহমদের বেড়ে ওঠার জমানায় তা এতটা দৃশ্যমান ছিল না। তাজউদ্দীন আহমদ যখন জনসেবার মানস নিয়ে এই ভূখণ্ডে রাজনীতি শুরু করেন, তখন এই বাংলা অঞ্চলেও তিনি বেশ ক'জন রাজনীতিমনস্ক, জনকল্যাণে নিবেদিত মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। সেটি তার ভবিষ্যৎ জীবনভাবনাকে আরও বলীয়ান করেছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাজউদ্দীন আহমদের পরিশ্রমী জ্ঞানযোগ, কর্মস্পৃহা, লক্ষ্যস্থির নিষ্ঠা, অবিরাম লেগে থাকার চেষ্টা আর সহ্য করার অসীম মনোবল। পরিণত বয়সে সুসাংস্কৃতিক পরিমিতিবোধ তার রাজনৈতিক জীবনকে আরও গভীরতর রাজর্ষি গুণে গুণান্বিত করে তোলে। ফলে মৃত্যুতে তো বটেই জীবনের বড় বড় বাধাতেও তিনি কক্ষচ্যুত হয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হননি।
দুই.
তাজউদ্দীন আহমদ স্কুলে থাকা অবস্থায় এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নানা রূপান্তরের ঘটনা ঘটতে থাকে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পাকিস্তানের অংশীভূত পূর্ববাংলার রাজনীতিতে চলতে থাকে নানা পরিবর্তন। ২২ বছর বয়সী তরুণ তাজউদ্দীন আহমদ সেই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় একজন সক্রিয় অংশীজন হিসেবে অংশ নেন। এবং জনগণের কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনের মানসে প্রগতিশীল জনসংগঠন গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় ফুলটাইম জড়িয়ে পড়েন। তার নমুনা মেলে তার লেখা ডায়েরিতে।
২৬ নভেম্বর ১৯৪৭, বুধবার তাজউদ্দীন আহমদ তার দিনলিপিতে লিখেছেন, 'সকাল ১১টায় অলি আহাদ এলেন। তাকে নিয়ে সোয়া ১১টায় ফজলুল হক মুসলিম হলে গেলাম। তোয়াহা সাহেবকে পেলাম না। আমরা কামরুদ্দীন সাহেবের বাসায় গেলাম। একটু পরে তোয়াহা সাহেবও এলেন। কামরুদ্দীন সাহেব মি. সোহরাওয়ার্দীর ধারণার আলোকে এখানকার মুসলিম লীগ এবং গোটা ভারতের রাজনীতিসহ সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলেন। আমরা আমাদের দলীয় কাজের ব্যাপারে কিছু সিদ্ধান্ত নিলাম। দলের একটা সচিবালয় খুলতে হবে। যাতে এসব বিভাগ থাকবে :১. অফিস (কামরুদ্দীন সাহেব), ২. পাঠচক্র (তোয়াহা সাহেব), ৩. পরিসংখ্যান (অলি আহাদ), ৪. প্রচার-প্রচারণা (তাজউদ্দীন)। পাঠচক্রটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মাঝে মাঝে অর্থনীতিবিদ ও মৌলিকত্বসম্পন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপকদের নিয়ে ক্লাস করবো। বিশেষ করে সমাজতন্ত্র ও ভারতীয় অর্থনীতি বিষয়ে।'
তিন.
জনসেবার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় তাজউদ্দীন আহমদের। এলাকার মানুষের চিকিৎসায় সহায়তার কাজটি ছাত্রাবস্থা থেকেই মন দিয়ে করতেন তিনি। গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে চিকিৎসা নিতে আসা এলাকার অসহায় মানুষের সহযোগিতার একটা অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তার ছিল ছাত্রাবস্থাতেই। বড় ভাইয়ের কলেজ পড়ুয়া ছেলে দলিলউদ্দীনের কাজই ছিল গ্রাম থেকে আসা রোগীদের ঢাকায় নির্দিষ্ট ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করেন আইয়ুব খান। ফলে তৎকালীন পাকিস্তানে রাজনীতি করা কঠিন হয়ে পড়ে। সামরিক শাসন জারি হওয়ার কিছুদিন পরে তরুণ রাজনীতিবিদ তাজউদ্দীন আহমদ একটি বেসরকারি সংস্থায় ম্যানেজার হিসেবে চাকরি নেন। সেখানে অফিস ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা, নিয়ম-নিষ্ঠা, ব্যক্তিত্ব প্রভৃতি ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এসব সৎ ও অনুকরণীয় গুণাবলির কারণে মালিক কয়েক মাসের ব্যবধানে তার মাসিক বেতন তিনশ' টাকা থেকে বাড়িয়ে আটশ' টাকায় উন্নীত করেন।
মালিকের এক ভাগ্নে কেনাকাটার ক্যাশমেমোতে টাকার অঙ্কের হেরফের করত। বিষয়টি তাজউদ্দীন আহমদের নজরে এলে তিনি তাকে বরখাস্ত করেন। পরদিন জানতে পারেন, মালিক তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এতে তিনি মালিককে বলেন, কাজটি তিনি ভালো করেননি। ক্ষমা করতে হলে নিয়মানুযায়ী ম্যানেজারের মাধ্যমে করা উচিত। এতে মালিক লজ্জাবোধ করেন এবং বলেন, ভবিষ্যতে আর এমন হবে না। কিন্তু আরও দু'বার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে তাজউদ্দীন আহমদ নিজেই চাকরি ছেড়ে দেন।
চার.
রাজনীতি আর রাষ্ট্র যে দুটি পৃথক জিনিস- এই শিক্ষাটা এই অঞ্চলের রাজনীতিতে তিনিই প্রথম দেন আমাদের। রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র হয়ে উঠতে দিতে চাইলে রাজনীতিকেও কিছু নীতি ও নৈতিকতার মধ্য দিয়ে চলতে হয়। সরকার, রাজনৈতিক দল আর রাষ্ট্র একাকার হয়ে গেলে গুটিকতকের পেট হয়তো ভরে; কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্র ফাঁপা হয়ে উঠতে থাকে। রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র হয়ে উঠতে দিতে চাইলে যে রাজনীতিবিদদেরও অনেক নিষ্ঠা, লোভহীনতা আর সিস্টেমের মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনির্মাণকে মেনেই এগোতে হয়- এই শিক্ষাটা কর্ম ও ভাবনার মধ্য দিয়ে তাজউদ্দীন আহমদের মতো করে খুব কম মানুষই আমাদের দিয়েছেন। ১৯৭৪ সালের ২০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলের সমাপনী অধিবেশনে একটি অসাধারণ বক্তৃতা করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
সে সময় তার অনেক কথা খোদ সরকার বা দলের লোকেরও পছন্দ হয়নি। সারাদেশ থেকে আসা দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে সেই বক্তৃতায় তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, "সবাই বলে চোর, চোর, চোর। তবে চুরি করে কে, কে তারা? আমি তো এই পর্যন্ত শুনলাম না বিগত দু'বছরে কোনো কর্মী এসে বলেছে যে, আমার চাচা ওই রিলিফের চাল চুরি করেছে। এমন তো কেউ বলেনি। বরং পল্টন ময়দানে বক্তৃতা করে দাবি করেন, দুর্নীতি ধরে ফেলতে হবে, আর দুর্নীতির অভিযোগে কেউ ধরা পড়লে বাড়িতে এসে বলেন তাজউদ্দীন ভাই আমার খালু ধরা পড়েছে, উনাকে ছেড়ে দেন। আমি বলি যে, আপনি না বক্তৃতা করে এলেন? উত্তর দেন বক্তৃতা করেছি সংগঠনের জন্য, আমার খালুরে বাঁচান। এই হলো বাংলাদেশের অবস্থা। কোথায় সামাজিক বয়কট? দুর্নীতি যারা করে তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক বয়কট করতে হবে।"
রাজনীতিতে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। সে কারণেই তার নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করতে ছিলেন দৃঢ়তর। আর ছিল তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। রাজনীতিতেও তিনি তার সফল প্রয়োগ করেছেন। ফলে তিনি অনেক ক্ষেত্রে এই ভূখণ্ডের কিছুটা পশ্চাৎপদ রাজনীতির চেয়ে ছিলেন অনেকটাই এগিয়ে। ছিলেন কিছুটা বেমানানও। এই ভূখণ্ডের অনাগত কালের মানুষের জন্য তাজউদ্দীন আহমদের জীবন ও কর্ম তাই এক বিস্ময় এবং জ্ঞানদীপ্ত কৌতূহলের বিষয় হয়ে রয়েছে। ৯৫তম জন্মদিনে রাজনীতির এই নৈতিক মানুষটিকে জানাই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, তাজউদ্দীন আহমদ পাঠচক্র
- বিষয় :
- জন্মদিন
- শুভ কিবরিয়া