সমকালীন প্রসঙ্গ
ভ্যাকসিন ঘোড়দৌড়ের ভয় ও অভয়
শেখ রোকন
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২০ | ১৫:৫১
করোনাভাইরাস সংক্রমণ বিশ্বব্যাপী যে উদ্বেগ, আতঙ্ক ও অতিমারি সৃষ্টি করেছে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে এর ভ্যাকসিন আবিস্কারে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির খবর তাতে বড় ধরনের স্বস্তি বয়ে এনেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে মহল্লার মুদির দোকানে গিয়ে দেখি, সেখানেও চলছে এ সংক্রান্ত আলোচনা। এটা ঠিক যে, ভাইরাসের ভ্যাকসিন উদ্ভাবন এবং তা ইউরোপ থেকে বাংলাদেশে আসতে এখনও অনেকটা পথ বাকি। কিন্তু যত দূরেই হোক, একটা কিছু প্রতিষেধক পাওয়া গেছে, সেটাই যেন অনেকখানি স্বস্তির। করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও বিস্তার রোধে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা, লকডাউন, যথার্থ পরীক্ষা ও চিকিৎসা- প্রভৃতি 'দেশীয়' পদ্ধতি দৃশ্যত ব্যর্থ হওয়ার পর এখন ভ্যাকসিনের ওপর ভরসা রাখা ছাড়া উপায় কী?
যদিও করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে যেসব কাণ্ড ঘটে চলছে, এর ভ্যাকসিন আবিস্কার নিয়ে বিশ্বব্যাপী চলমান ঘটনাবলি তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। যেমন উত্তর কোরিয়ার স্টেট কমিশন অন সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বলছে, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিস্কারে তারাও তৃতীয় ধাপে বা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানবদেহে প্রয়োগের পর্যায়ে রয়েছে। এর আগে দেশটি ঘোষণা করেছিল, তারা 'জিরো সংক্রমণ'। উত্তর কোরিয়ায় একজনও করোনা সংক্রমিত হয়নি। তারা তাহলে কীভাবে গবেষণা করছে এবং এই ভ্যাকসিন দিয়ে কী করবে, সেই প্রশ্ন তুলে সিএনএন বলছে- এটা আসলে প্রমাণ করার চেষ্টা যে, উত্তর কোরিয়ার অসাধ্য কিছুই নেই এবং কিম জং উন যে কোনো পরিস্থিতিতে তার দেশবাসীকে রক্ষা করতে সক্ষম।
ওদিকে মঙ্গলবার ইউএস জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন গবেষণার তথ্য চুরি করতে চাইছে চীনা হ্যাকাররা। দেশটির সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল জন ডেমারস দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পর চীনা হ্যাকারদের এই অপচেষ্টা 'লজ্জাজনক'। বলাবাহুল্য, চীন এই অভিযোগ পত্রপাঠ নাকচ করে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লিউ জিয়াউমিং টুইট করেছেন- 'এ ধরনের অভিযোগ চীনা বিজ্ঞানী ও তাদের অর্জনের প্রতি অশ্রদ্ধা ছাড়া কিছু নয়; এতে করে করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন গবেষণা ও উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও ক্ষুণ্ণ হতে পারে'। যথেষ্ট কড়া প্রত্যুত্তর, সন্দেহ নেই।
মঙ্গলবারই রাশিয়ার উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী রুসলান সালিকভ ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের ভ্যাকসিন চূড়ান্ত উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য 'সম্পূর্ণ প্রস্তুত'। আগামী মাসে, আগস্টেই তাদের নাগরিকদের দেওয়া হবে এই ভ্যাকসিন। আরও কয়েকদিন আগে দেশটি তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার ঘোষণা দিয়েছিল। এখন বলছে, ওই ধাপ সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করতে পেরেছে তারা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার পক্ষ থেকে অবশ্য অভিযোগ করা হয়েছিল, রাশিয়ার পক্ষ থেকে করোনাভ্যাকসিন গবেষণার তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলেছে। মস্কো যথারীতি এমন অভিযোগ অর্থহীন হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল।
আগস্টের মধ্যে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে তাদের স্বাধীনতা দিবসের আগেই, করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের ঘোষণা দিয়েছিল প্রতিবেশী দেশ ভারতও। এভাবে দিনক্ষণ ধরে ভ্যাকসিন আবিস্কার করা সম্ভব কিনা, সেই প্রশ্ন ভারতের ভেতর থেকেই উঠেছিল। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতেও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কেবল ভারতে চলেছে এমন নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে চলছে চাপান-উতর। এভাবে 'জোস' দেখাতে গিয়ে 'আবিস্কৃত' ভ্যাকসিন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে 'ডাম্প' করা হয় কিনা, রাজনীতির সার্কাস দেখার আনন্দের বাইরে সেটাই ভয়।
আমি বিশেষজ্ঞ নই- না করোনাভাইরাসের, না কোনো ভ্যাকসিনের। আগ্রহী পর্যবেক্ষক মাত্র। করেনাভাইরাস মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের উদ্যোগ ও পদক্ষেপ অভিনিবেশ সহকারে দেখতে গিয়ে মনে হয়েছে- যারা যত সফল, তাদের আওয়াজ তত কম। কিংবা যারা কথা কম বলছে, তারা আসলে কাজ বেশি করছে। করোনা ভ্যাকসিন উদ্ভাবনবিষয়ক তথ্য-উপাত্তের দিকে নজর রাখতে গিয়েও চোখে পড়ছে একই পরিস্থিতি। যেমন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দলটির প্রধান অধ্যাপক সারাহ গিলবার্ট গবেষণার ফল নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করলেও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে চাননি। দিনক্ষণ নির্ধারণ কিংবা বাগাড়ম্বরের তো প্রশ্নই আসে না। গার্ডিয়ান তার কাছে খুব নিরীহভাবে জানতে চেয়েছিল, কবে নাগাদ এই ভ্যাকসিন জনসাধারণের হাতে পৌঁছতে পারে। এমন প্রশ্নে তিনি লম্বা সময়সীমা দিতে পারতেন। যেমন এই বছর নাগাদ কিংবা আগামী বছর নাগাদ। কিন্তু তার বদলে বলেছেন, আমাদের কারও হাতে 'ক্রিস্টাল বল' নেই। মানে জ্যোতিষীদের মতো ভবিষ্যৎ দেখার পাথর নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবেই বিভিন্ন দেশের দুই শতাধিক সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সর্বব্যাপ্ত এই সংক্রমণের ভ্যাকসিন আবিস্কারের ঘোড়দৌড়ে রয়েছে। কাদের উদ্যোগ কোন পর্যায়ে রয়েছে সেটা বোঝার জন্য বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম চালু করেছে 'ভাইরাস ট্র্যাকার'। আমি দ্য গার্ডিয়ানেরটা নিয়মিত দেখি। সেখানে যে ২৪টি উদ্যোগকে সবচেয়ে এগিয়ে রাখা হয়েছে, তার মধ্যে অন্তত এক তৃতীয়াংশ চীনা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান। যে তিনটি উদ্যোগ তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে, তার মধ্যে দুটিই চীনা উদ্যোগ- সিনোভ্যাক এবং বেইজিং ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি। কিন্তু দেখা যাবে, এর ভ্যাকসিন নিয়ে চীনা হাঁকডাকই সবচেয়ে কম। এমনকি পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমেও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ নিয়ে যতটা আলোচনা, সিনোভ্যাকের উদ্যোগ নিয়ে ততটা নয়।
এখানেই শেষ নয়। উন্নত দেশগুলো কেবল ভ্যাকসিন আবিস্কারের ঘোড়দৌড়ে নেই। কেউ আবিস্কার করতে পারলে 'সবার আগে' যাতে নিজের দেশের নাগরিকদের জন্য কিনে নিতে পারে, সেই প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে আরও কয়েক মাস আগে। মনে আছে, জার্মান একটি ওষুধ কোম্পানি এ ব্যাপারে অগ্রগতির আভাস দেওয়া মাত্রই খোদ হোয়াইট হাউস তাদের সঙ্গে বসেছিল। কীভাবে এই ভ্যাকসিন তারা 'এক্সক্লুসিভ' পেতে পারে। তখন জার্মান এক মন্ত্রীর মন্তব্যটি ছিল চমৎকার 'জার্মানি ইজ নট ফর সেল'। জার্মানি বিক্রির জন্য নয়। তবু যার পয়সা আছে, তারা সবাইকে কিনতে চাচ্ছে। এমনকি যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নিয়ে এত কথা, তার দেশ যুক্তরাজ্যও অন্তত ১২টি সম্ভাব্য ভ্যাকসিন আগাম কিনে রাখার প্রস্তুতি নিয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। ধনী দেশগুলোর এই মনোভাবের একটি নামও চালু হয়েছে 'ভ্যাকসিন ন্যাশনালিস্ট'। টিকা জাতীয়তাবাদের সেই দৌড়ে বাংলাদেশের মতো দেশের পক্ষে প্রতিযোগিতা কঠিন, বলা বাহুল্য।
আমাদের দেশেও অবশ্য একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন উদ্ভাবন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল সংবাদ সম্মেলন করে। এর পক্ষে ও বিপক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কম কথা হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে দুই শতাধিক উদ্যোগের তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে আমরা কত নম্বরে জানা নেই। চীনা ভ্যাকসিনের এক দফার ট্রায়াল বাংলাদেশে হতে পারে শোনা গিয়েছিল, এ নিয়ে বুধবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এটা কবে কীভাবে সম্পন্ন হবে তা নিধারণ করবে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি।
বাংলাদেশের মতো দেশের আর্থিক সামর্থ্য ও রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় করোনা ভ্যাকসিনকে 'গ্লোবাল কমন গুড' ঘোষণার দাবি তুলেছেন আমাদের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ ইউনূস। জাতিসংঘ মহাসচিবও একই দাবি জানিয়েছেন। এই দাবি আরও জোরে তোলা দরকার। বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কণ্ঠস্বর একত্র হওয়া দরকার।
সন্দেহ নেই, করোনাভাইরাসে সংক্রমণের মুখে থাকা মানবজাতি এর ভ্যাকসিনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। সন্দেহ নেই, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় দফার ট্রায়ালে সাফল্যে যাওয়ার খবর ভীতসন্ত্রস্ত বিশ্ববাসীর জন্য অভয় নিয়ে এসেছে। কিন্তু এই খবরে বাংলাদেশের মতো দেশের অপেক্ষার অবসান ঘটল কি? প্রশ্নটি সরল হলেও উত্তর সহজ নয়।
লেখক ও গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- শেখ রোকন