ঐতিহ্য
'বীরচন্দ্র গণপাঠাগার' হোক জাতীয় ঐতিহ্যস্থল
শাহেদ কায়েস
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৫:০৪
উন্নয়ন আমরা সবাই চাই। তবে ঐতিহ্যের গায়ে কুঠার চালিয়ে উন্নয়ন করা যাবে না। আমাদের এই চাওয়া, না-চাওয়া যে খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে না তা বুঝিয়ে দিতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। ফলে ১৩৫ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা 'বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন' ভেঙে বহুতল স্থাপনা নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেখানকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এবং প্রগতিশীল কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু এই প্রতিষ্ঠানটি। ১৮৮৫ সালে তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার চাকলা রোশনাবাদের জমিদার নরেশ মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুর এটি প্রতিষ্ঠা করেন। স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন এ মিলনায়তনে পদধূলি দিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আরও অনেক মনীষী।
ঐতিহ্য বা হেরিটেজ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে 'পরম্পরায় চলে আসে এমন চিন্তা, বিশ্রুতি বা বিশ্বাস।' ঐতিহ্যবাহী যে কোনো স্থাপনার থাকে দীর্ঘ এক ইতিহাস। পৃথিবীর দেশে দেশে এই স্থাপনাগুলো যখন সংরক্ষণ করা হচ্ছে, আমরা তখন ধ্বংসযজ্ঞে মেতেছি।
একটি দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কালক্রমে সেই দেশ-জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জাতিসত্তা বিকাশের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা উদ্ঘাটনে, আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য সঠিকভাবে অনুধাবন করতে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে ২০০৮ সালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলোকে রক্ষা এবং এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে 'সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা কনভেনশন' তৈরি করে জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো। যে কোনো পুরোনো স্থাপনা পুরোনো বলেই পুরাতত্ত্ব, এই প্রত্ন নিদর্শনগুলো খুবই মূল্যবান। পুরোনো স্থাপনায় ব্যবহূত ইট, কাঠ, পাথরের ব্যবহার হয়েছে, যা আমাদের গৌরবময় অতীত ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আছে। উন্নত বিশ্ব তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মহলের ব্যক্তিস্বার্থে, কখনও রাষ্ট্রের অসাধু চক্রের যোগসাজশে, কখনও-বা সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অদূরদর্শিতা ও অবহেলায় দেশের অনেক পুরাতত্ত্ব ধ্বংস হচ্ছে, যা আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। দেশের পুরাকীর্তিগুলো আমাদের সমৃদ্ধ অতীতের পরিচায়ক। আর এসব বিলুপ্তির অর্থ হচ্ছে দেশের ইতিহাসকে, অতীত গৌরবকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা।
খোঁজ নিয়ে জেনেছি, কুমিল্লায় বীরচন্দ্র পাঠাগারটি ধ্বংসে তৎপর রয়েছেন প্রভাবশালীরা। তারা 'বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন' ভেঙে বহুতল ভবন বানানোর পাঁয়তারা করছেন। বীরচন্দ্র পাঠাগারের সামনের মাঠটিই কুমিল্লার মানুষের কাছে টাউন হল নামে পরিচিত। এমন একটি খোলা মাঠ যে ওইসব লোভীর ক্ষুধা বাড়াবে- এটা আমরা জানি। তাই বলে তাদের মতো মানুষের উদরপূর্তির জন্য আমরা তো আমাদের গর্বের ধন ছেড়ে দিতে পারি না। অন্য কোথাও প্রভাবশালী কেউ বন উজাড় করছেন, কেউবা নদী খেয়ে হজম করে ফেলছেন। আমরা উন্নয়ন চাই, তবে এমন ঐতিহ্য বিনাশী উন্নয়ন কখনোই চাই না। 'বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন' ভেঙে ফেলার ঐতিহ্য বিধ্বংসী এই উদ্যোগের প্রতিবাদ জানাই। এই ঐতিহ্যনাশী উন্নয়ন থামাতে সম্মিলিত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ জরুরি। এই অমূল্য পুরাকীর্তিটি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।
আসুন আমরা দাবি তুলি, স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন কুমিল্লার ১৩৫ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা 'বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন'টিকে রক্ষা করতে ন্যাশনাল হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করা হোক। আশা করছি, সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।
কবি, পরিবেশ ও মানবাধিকারকর্মী
- বিষয় :
- ঐতিহ্য
- শাহেদ কায়েস