ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

করোনাবর্জ্য

কুইনাইন সারাবে কে

কুইনাইন সারাবে কে
×

ছবি: ফাইল

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২০ | ১৫:৩৭

আমাদের সাধারণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েই অভিযোগের অন্ত নেই। তার ওপর চলমান দুর্যোগে করোনাবর্জ্যের যে অব্যবস্থাপনা আমরা দেখছি, তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সোমবার সমকালে প্রকাশিত 'করোনাবর্জ্যে বিপদ' শীর্ষক প্রতিবেদনে বিস্ময়করভাবে আমরা দেখছি, রাজধানীর নানা সড়কের মতো উন্মুক্ত জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ব্যবহূত করোনা সুরক্ষা সামগ্রী- মাস্ক, গ্লাভস, ফেসশিল্ড। এমনকি ব্যবহূত পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্টের (পিপিই) মতো সংবেদনশীল সুরক্ষা সামগ্রীও যেভাবে যেখানে-সেখানে ফেলা হচ্ছে, তাতে সংক্রমণের ঝুঁকি কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। এই বর্জ্যের পরিমাণ এতটাই বেশি যে, বিষয়টি উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের গত মাসের একটি গবেষণা প্রতিবেদন মতে, প্রতিদিন এ ধরনের বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে ২৮২ দশমিক ৪৫ টন। যার পুরোটাই কেন গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে অপসারণ করা হবে? শুধু হাসপাতাল নয়, করোনাবর্জ্যের বড় একটি অংশ যে বাসাবাড়ি, শপিংমল বা বেসরকারি অফিস থেকেও আসছে তা বলাই বাহুল্য। আমরা মনে করি, করোনাদুর্যোগকে যেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে, করোনাবর্জ্য ব্যবস্থাপনারও একইভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত। করোনা সংক্রমণ রোধে ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবেই করোনাবর্জ্য যাতে সংক্রমণ বাড়াতে না পারে, সেজন্য এগুলো নির্দিষ্ট উপায়ে ব্যবস্থাপনার কথা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। এ জন্য পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সেভাবে নির্দেশনা প্রদান করা জরুরি।

করোনাদুর্যোগের শুরু থেকেই মানুষ সুরক্ষার জন্য মাস্কসহ অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহার করছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে সরকার পক্ষ সর্বত্র 'নো মাস্ক নো সার্ভিস'-এর নির্দেশনা জারি করেছে। ফলে সরকারি-বেসরকারি কোনো অফিসেই মাস্ক ছাড়া কেউ সেবান পাবে না। মাস্ক পরা বাধতামূলক করা করোনা থেকে সুরক্ষার স্বার্থেই জরুরি। কিন্তু ব্যবহারের পর সেই মাস্ক যদি এখানে-সেখানে ফেলা হয়, তা যদি নির্দিষ্ট উপায়ে ব্যবস্থাপনা করা না হয়- সেটি নিঃসন্দেহে ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ আমরা দেখেছি। গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে কভিড সুরক্ষা সামগ্রী থাকলে তা নেওয়া হবে না বলে এ বছরের মাঝামাঝি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এমনকি এসব বর্জ্য আলাদা রাখার জন্য দুটি সিটি করপোরেশন থেকে পচনশীল পলিথিন ব্যাগ বিতরণ করা হয়। এ লক্ষ্যে প্রচারণা চালানো হলেও অনেকেই যেমন আগ্রহ দেখাননি, তেমনি ওই আলাদা ব্যাগও বাসাবাড়িতে দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে দুই পক্ষকেই উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। আমরা জানি, মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ২০০৮ সালে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা করা হয়; এক যুগেও তা বাস্তবায়ন না হওয়াটা হতাশাজনক। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী, মেডিকেল বর্জ্যগুলো বিশেষ মেশিনের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করে তা বায়োহ্যাজার্ড ব্যাগে ভরে রাখার কথা বলা হলেও কার্যত অধিকাংশ হাসপাতালই যে তা করছে না, সেটির নজরদারি করবে কে? তার পরও দু-একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হাসপাতাল থেকে মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহের কাজ করে।

কিন্তু বাসাবাড়ির ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য সংগ্রহে কোনো ব্যবস্থাই নেই। ফলে ঢাকাসহ সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নতুন করে ঢেলে সাজানো জরুরি হয়ে পড়েছে। সোমবার সমকালেরই ভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, করোনাবর্জ্যের কারণে 'হুমকিতে পরিযায়ী পাখিও'। শীতের এ সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি এলেও সেখানকার লেকে যত্রতত্র ব্যবহূত মাস্ক-গ্লাভস ফেলায় পাখি ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আমরা মনে করি, করোনাবর্জ্য তো বটেই, যে কোনো বর্জ্যেরই যদি যথাযথ ব্যবস্থাপনা করা না হয়, তা যেমন মানুষের ক্ষতির কারণ হবে, তেমনি পরিবেশ-প্রকৃতির ওপরও তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। আমাদের প্রত্যাশা, করোনা সুরক্ষায় সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ করোনাবর্জ্য ব্যবস্থানায়ও নজর দেবে। কেবল রাজধানী নয়, সারাদেশেই মানুষ যেহেতু সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করছে, সে জন্য শহর ও গ্রাম ভেদে আলাদা নির্দেশনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা চাই। একই সঙ্গে বাজারে বহুল প্রচলিত সিনথেটিক মাস্কের বদলে যথাযথ মান নিশ্চিত করে সবার জন্য পরিবেশসম্মত কাপড়ের মাস্ক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। মাস্ক ও অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী যদি করোনা সারায়, তবে এদেরও সারানোর ব্যবস্থা করতে হবে। 

আরও পড়ুন

×