সবজির ন্যায্য দাম
কৃষকের বঞ্চনার অবসান হোক
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, ফাইল ফটো
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৫:৪৭
দেশব্যাপী সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে, এটা সুসংবাদ। দুঃসংবাদ হলো, কৃষক উৎপাদিত সবজির ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। উৎপাদক শ্রেণির উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়া নতুন খবর নয়। শনিবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এর পুনরাবৃত্তি ঘটেছে মাত্র। আমাদের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কিংবা কারসাজির কারণে একদিকে উৎপাদকরা যেমন পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে ভোক্তারা হন নাকাল। শীতকাল সবজির ভরা মৌসুম। শীতের সবজির দিকে ভোক্তাদেরও বাড়তি আকর্ষণ থাকে। বাজারে এবার সবজি সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই বটে, কিন্তু কৃষকের লাভ পাওয়া দূরের কথা; উৎপাদন খরচ ওঠানোই তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে তৃণমূলের কৃষকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। উৎপাদন ক্ষেত্রে যে সবজি বিক্রি হচ্ছে ২ টাকা কেজি দরে; ঢাকায় সেই সবজির কেজি ১৫ থেকে ২০ টাকা। টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, শিমসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির দামের ক্ষেত্রে তারতম্য একই রকম। মধ্যস্বত্বভোগীদের অধিক মুনাফা লোটার পুরোনো এই প্রবণতা নানামুখী বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
কৃষক শুধু উদয়াস্ত পরিশ্রমই করেন না; অনেক কৃষকই তাদের উৎপাদনে ধার-দেনানির্ভর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন পরিস্থিতিতেও বহুল আলোচিত তাদের বঞ্চনা নিরসনে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বাজার বিশ্নেষকরা সরবরাহ চ্যানেলে সংস্কারের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করে এলেও বিষয়টি সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের প্রতিশ্রুতির মধ্যেই। পাইকার কিংবা আড়তদাররা খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে উৎপাদক আর ভোক্তার পকেট কাটে। ভালো ফলন সত্ত্বেও ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে কৃষকের জীবিকা-সংকট কাটে না। তাদের সামনে আয়-রোজগারের বিকল্প পথও সংকুচিত। এমতাবস্থায় তারা পড়েছেন উভয় সংকটে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে চড়া দাম গোনেন ভোক্তা আর ঠকেন কৃষক। এই লাভবান শ্রেণির অতি মুনাফা রুখতে ও কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে নজরদারি ও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করার তাগিদ ইতোপূর্বে আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে দিয়েছি। আমরা জানি, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কৃষিজাত পণ্যের কৃষক ও খুচরা পর্যায়ে যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করে দেয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের মার্জিন যোগ করেই। কিন্তু বাস্তবতা সাক্ষ্য দিচ্ছে, এ সবই থেকে যায় কাগজপত্রে। কৃষকদের লাভবান হতে না পারা, কিংবা ন্যায্য দাম না পাওয়া ও ভোক্তাকে অযৌক্তিক উচ্চ দামে পণ্য কেনা; এ সবই বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি- এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা মনে করি, আদর্শ বাজার ব্যবস্থা কিংবা বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগই বিদ্যমান বৈপরীত্য ঘুচাতে পারে। বাজারে 'সিন্ডিকেট' ভেঙে দিয়ে কৃষিনির্ভর এ দেশে কৃষকের বঞ্চনার নিরসন করতে না পারলে অনেক ক্ষেত্রেই এর বিরূপতা দেখা দেবে। কৃষক ও ভোক্তাস্বার্থ রক্ষায় এ পর্যন্ত কথা হয়েছে বিস্তর। কিন্তু কাজের কাজ যে তেমন কিছুই হয়নি; বিদ্যমান বাস্তবতা এরও সাক্ষ্যবহ। সবজিসহ সব খাদ্যপণ্যের দাম নিশ্চিত করতে উন্নত বিপণন ব্যবস্থার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের দিকেও নজর বাড়াতে হবে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষকের বাজার বা বিপণন কেন্দ্র বিস্তৃত পরিসরে প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন, যাতে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বিক্রি করতে পারেন। তাতে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই লাভবান হবেন। মনে রাখা দরকার, মুনাফা অর্জনের সব উপায়ই গ্রহণযোগ্য নয়। বাজারে যে 'অদৃশ্য হাত' রয়েছে, তা গুটাতে কঠোর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
কৃষকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই হবে। কৃষক যদি আর্থিকভাবে সুরক্ষিত বোধ না করেন, তাহলে তারা কৃষিকাজে উৎসাহ হারাবেন এবং কৃষিজমি ক্রমাগত অকৃষি কাজে ব্যবহূত হতে থাকবে। কৃষকের অর্থবল, মনোবল দুই-ই জরুরি। বিপুল শ্রম ও অর্থ ব্যয়ে উৎপাদিত সবজির ন্যায্য দাম না পেলে দুই কূলই রক্ষা করা কঠিন। প্রধান কৃষিজাত পণ্য ধানের পাশাপাশি অন্যান্য রবিশস্য ও সবজি উৎপাদনের পরিসর বাড়ানো, উৎপাদকের ন্যায্য দাম প্রাপ্তির নিশ্চিয়তার বিষয়টি কথার কথা না হয়ে থাকলেই মঙ্গল।
- বিষয় :
- সবজি
- সবজির ন্যায্য দাম
- ন্যায্য দাম
