অর্থনীতি
টেকসই উন্নয়নে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্ব
আনোয়ার ফারুক তালুকদার
প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫:১৩
টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য আঞ্চলিক বাণিজ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলে বাণিজ্যের পরিমাণ অনেক কম। বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে রয়েছে। মূলত দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চার ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছে- উচ্চ শুল্ক্ক, আধা শুল্ক্ক ও অশুল্ক্ক বাধা, যোগাযোগ খরচ এবং সীমান্তে আস্থার সংকট। বিভিন্ন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ অঞ্চলের গড় শুল্ক্ক হার অন্যান্য অঞ্চলের দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য ব্যয়ও সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ পৃথিবীর অন্য যে কোনো অঞ্চলের চেয়ে এ অঞ্চলে আমদানিতে সবচেয়ে বেশি বাধার সম্মুখীন হতে হয়। দেশগুলো উচ্চহারে নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্ক্কারোপ করে এ অঞ্চলে বাধা সৃষ্টি করে রাখছে। পাশাপাশি এক তৃতীয়াংশ পণ্য সংবেদনশীল পণ্যের তালিকায় ফেলা হয়েছে। ফলে পণ্যের সংখ্যা কমে গিয়ে বাণিজ্যের পরিমাণও কমছে। সম্প্রতি ড. সঞ্জয় কাঠুরিয়া তার গবেষণা প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন, এ অঞ্চলে বিদেশি বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ হচ্ছে নিজেদের মধ্যে। আসিয়ান দেশগুলো বহির্বাণিজ্যের ২৬ শতাংশ করে নিজেদের মধ্যে। ইইউতে আঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৬০ শতাংশ। আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে সাফটা ভূমিকা রাখতে পারেনি। ২০০৪ সালে যখন সাফটা (সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া) চুক্তি হয়, তখন বিশ্ববাণিজ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের অংশগ্রহণ ছিল ৫ শতাংশ। সাফটা করার উদ্দেশ্যই ছিল এ অঞ্চলের বাণিজ্য বাড়ানো। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, সাফটা চুক্তির পর দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যে উল্টা গতি আমরা দেখেছি। বর্তমানে তা কমে হয়েছে আড়াই শতাংশ। কাঠুরিয়া তার প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের মধ্যে ৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলার মূল্যের বাণিজ্যের সম্ভাবনা আছে। অথচ হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্য আড়াই গুণে উন্নীত হতে পারে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে ১ হাজার ৮৯০ কোটি ডলার মূল্যের বাণিজ্য করতে পারে। বিপরীতে হচ্ছে মাত্র ৭৬০ কোটি ডলার। ভারতের সঙ্গে হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গেও বাণিজ্য অন্তত ৫৪ কোটি ডলার, শ্রীলংকার সঙ্গেও আরও ৪২ কোটি ডলারের বাণিজ্য বৃদ্ধি সম্ভব। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়িয়ে বাংলাদেশের ভোক্তা, উদ্যোক্তাসহ সংশ্নিষ্ট সবাই লাভবান হতে পারেন।
২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশের তালিকাভুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে অবশ্যই প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে হবে। রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ প্রয়োজন। পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্য খাতেও সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। বাংলাদেশের পাশে রয়েছে বিশ্বের দুটি বড় অর্থনীতির দেশ ভারত ও চীন। ফলে প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের ব্যাপক সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন। আমাদের বড় বড় রপ্তানি আয়ের দেশে করোনার ব্যাপক প্রভাব স্পষ্ট। সেখানে জীবনযাপন স্বাভাবিক হতে কত সময় নেবে, তা বলা যাচ্ছে না। যদিও ইতোমধ্যে করোনার টিকা প্রয়োগ শুরু হয়েছে তথাপিও আশঙ্কা রয়েই গেছে। ফলস্বরূপ আমেরিকা, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, জাপান ইত্যাদি দেশে আমাদের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে শক্তিশালী কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্যের জন্য রাজনীতির ভূমিকাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাজারগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে বাণিজ্য অনেকটা সহজ হয়ে উঠবে। ভ্যালু চেইন সৃষ্টি করা গেলে এক দেশের পণ্যের প্রতি অন্য দেশের ব্যবসায়ীরা আগ্রহী হবেন।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির অবারিত সুযোগ রয়েছে। সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় এসব রাজ্যে পণ্য পরিবহনেও বিদ্যমান ব্যবস্থা অনেকটা অনুকূল। যে কারণে এসব রাজ্যে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক ভারসাম্য অনেকটা বজায় রাখা সম্ভব। কিন্তু কার্যকরী উদ্যোগের অভাবে বাংলাদেশের পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ভারতের রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য তেমন বাড়নো যাচ্ছে না।
আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে বাণিজ্যের পথ সুগম করতে হবে। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণও জরুরি এবং নীতিমালায়ও আনতে হবে পরিবর্তন। নন-ট্যারিফ সংক্রান্ত বাধা যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য লিবারেল ট্রেড পলিসি দরকার। সময়ে সময়ে মুদ্রা বিনিময় হার যৌক্তিক করা যেতে পারে, তাতে করে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে। বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে বিশ্বের অনেক দেশ লাভবান হয়েছে। চিলি, মেক্সিকো ও ভিয়েতনাম তাদের মধ্যে অন্যতম। করোনার দাপটে যখন ইউরোপ, আমেরিকা জর্জরিত, তখন বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনেকটা ভালোর দিকে। এ অবস্থায় আমাদের রপ্তানি পণ্যের নতুন বাজার খুঁজতে হবে। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বাণিজ্যের বিকল্প হয় না। যেহেতু এই অঞ্চলে প্রায় একই আবহাওয়া, পরিবেশ বজায় রয়েছে তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানোর এখনই উপযুক্ত সময়।
ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্নেষক
- বিষয় :
- অর্থনীতি
- আনোয়ার ফারুক তালুকদার