ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

কেয়ারগিভার ও প্রবাসী আয়

কেয়ারগিভার ও প্রবাসী আয়
×

গোলাম শওকত হোসেন

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০

কেয়ারগিভারের বাংলা শব্দার্থ হচ্ছে শুশ্রূষাকারী। সংজ্ঞানুযায়ী, পারিশ্রমিক বা বিনা পারিশ্রমিকে কোনো ব্যক্তি যদি অন্য কোনো ব্যক্তিকে দৈনন্দিন সেবা দেয় তবে তাকে কেয়ারগিভার বলে। সেবা দেওয়ার বিষয়ে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকতে পারে, আবার নাও পারে। কিন্তু বর্তমানে উন্নত বিশ্বে শুশ্রূষাকারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াসাপেক্ষে সনদ পেতে হয়। পৃথিবী যতই উন্নত হচ্ছে, মানুষের গড় আয়ু ততই বাড়ছে। অর্থাৎ প্রবীণের সংখ্যা যত বাড়ছে, তাদের সাহায্য করার জন্য কেয়ারগিভার বা শুশ্রূষাকারীদের ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়ছে। বর্তমানে কেয়ারগিভারের চাহিদা পৃথিবীব্যাপী। কারণ, বৃদ্ধ বয়সে একজন মানুষ তার দৈনন্দিন কাজে স্বাবলম্বিতা হারায়। তখন পরিবারের অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে পরিবারের অন্যরা অত্যন্ত ব্যস্ত থাকে সকাল-সন্ধ্যা। তাই কেয়ারগিভার বা শুশ্রূষাকারী সচ্ছল আধুনিক পরিবারে অনেকটা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
১৯০০ সালে পৃথিবীতে মানুষের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৪০ বছর। আর ২০২০ সালে তা দাঁড়ায় ৭৩ বছরে। এভাবে চললে হিসাব অনুযায়ী ২০৫০ সালে পৃথিবীতে মানুষের গড় আয়ু হবে প্রায় ৭৮ বছর এবং জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশই হবে প্রবীণ, যাদের নানা প্রকার বার্ধক্যজনিত শারীরিক বা মানসিক সমস্যা থাকা স্বাভাবিক।
কেয়ারগিভার বা শুশ্রূষাকারীদের অত্যন্ত ধৈর্যশীল, সহমর্মিতাসহ কতগুলো গুণের অধিকারী হতে হয়। কেয়ারগিভার বা শুশ্রূষাকারীদের প্রকারভেদ আছে। যেমন- ১. পারিবারিক কেয়ারগিভার অর্থাৎ পরিবারের কেউ যদি পেশাদারভাবে শুশ্রূষা করে, ২. পেশাদার সনদপ্রাপ্ত শুশ্রূষাকারী, যে কোনো সংস্থার মাধ্যমে কাউকে সেবা দেয় ও চাকরির সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, ৩. ইন্ডিপেনডেন্ট কেয়ারগিভার অর্থাৎ সনদপ্রাপ্ত শুশ্রূষাকারী কিন্তু কোনো সংস্থার মাধ্যমে কাজ করে না বরং ব্যক্তিগত সনদ ও ইনকাম ট্যাক্স প্রদানের মাধ্যমে কাজ করে, ৪. ইনফরমাল কেয়ারগিভার অর্থাৎ চেনা পরিচিত শুশ্রূষাকারী সনদপ্রাপ্ত বা বিনা সনদপ্রাপ্ত অর্থ বা অন্য কিছুর বিনিময়ে সেবাদানকারী, ৫. স্বেচ্ছায় শুশ্রূষাকারী অর্থাৎ অনেকটা স্কাউটিং বা রেড ক্রসের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সেবা দানকারী। তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হয়।
বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে কেয়ারগিভারদের চাকরির ব্যাপক চাহিদা আছে। ২০০০ সালের আগে বাংলাদেশে এর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ধারণা ছিল না। এ বিষয়ে প্রথম বাংলাদেশে উদ্যোগ গ্রহণ করে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন। কিন্তু তাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো সার্টিফায়েড পরামর্শক ছিলেন না। তখন তারা ইউকে বেজড স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে এ দেশে সার্টিফায়েড কেয়ারগিভার তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করে। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম বেভারিজ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দুস্থ মানুষের অবস্থা থেকে শিক্ষা নিয়ে তার সোশ্যাল ইন্স্যুরেন্স অ্যান্ড অ্যালাইড সার্ভিসেসের মাধ্যমে স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশনের চিন্তা শুরু করেন। বাংলাদেশে ২০০৬ সালে ড. রাহমান জিলানী এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এনজিও ব্যুরো ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। ২০০৮ সালে এর কার্যালয় স্থাপিত হয় ঢাকায়। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে কেয়ারগিভারদের জন্য শিক্ষানীতি, শিক্ষা কার্যক্রম, পরীক্ষা ও সনদ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এর উদ্দেশ্য- ১. সেবা প্রদান, ২. সামাজিক উন্নয়ন, ৩. অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি, ৪. কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, ৫. কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, ৬. বেকারত্ব দূরীকরণ, ৭. সুনাগরিক হিসেবে শিশুদের গড়ে তোলা, ৮. বৃদ্ধদের সার্বিক সহযোগিতা করা। কোর্সে ভর্তির নূ্যনতম যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস। শিক্ষা কার্যক্রমের মোট সময় ৩৬০ ঘণ্টা, যার ৬০ ঘণ্টা তাত্ত্বিক, ২৪০ ঘণ্টা ব্যবহারিক, ৬০ ঘণ্টা বেসিক ইংরেজি এবং অন্য কোনো ভাষা জানা অতিরিক্ত যোগ্যতা বলে বিবেচিত। কারণ ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, কোরিয়া বা তাইওয়ানে প্রবীণের সংখ্যা অনেক বেশি। এসব দেশে কেয়ারগিভারদের চাহিদা ব্যাপক, যা বাংলাদেশের বিপুল জনশক্তিকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য হতে পারে সুবর্ণ ক্ষেত্র। শিক্ষিত বেকার তৈরি না করে ছেলেমেয়েদের সার্টিফায়েড কেয়ারগিভারের প্রশিক্ষণ দিয়ে
গড়ে তুললে এর ইতিবাচক প্রভাব হবে বহুমুখী।
ডা. গোলাম শওকত হোসেন : চিকিৎসক ও শিক্ষক

আরও পড়ুন

×