ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

রাজনীতি নষ্ট করেছে কারা?

রাজনীতি নষ্ট করেছে কারা?
×

খায়রুল কবীর খোকন

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৩ | ১৮:০০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও খ্যাতিমান লেখক-প্রাবন্ধিক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্প্রতি একটি দারুণ বিষয়ে কলাম লিখেছেন। জনপ্রিয় বাংলা সংবাদপত্র দৈনিক সমকালে গত ৭ মে (২০২৩) প্রকাশিত নিবন্ধটির শিরোনাম– ‘রাজনীতির প্রতি অনাস্থা বাড়ল কেন?’ তিনি কলামটি লিখেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। নিবন্ধটি আমার কাছে বেশ কৌতূহল-জাগানিয়া মনে হয়েছে।

সবাই জানেন, ক্ষমতাসীন দলের টানা তৃতীয় মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আমাদের অনেকের কাদের ভাই প্রায় প্রতিদিনই নানা বক্তব্য দেন। সেগুলো ফলাও করে মিডিয়ায় প্রকাশ হয়। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর বক্তব্যের বেশিরভাগই রাজনীতি নিয়ে। কিন্তু তিনি যত না নিজেদের দল ও রাজনীতির কথা বলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বলেন বিএনপির কথা। প্রায় প্রতিদিনই বিএনপিকে অযাচিত উপদেশ দিতে দিতে তিনি নিজের রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোকে একঘেয়ে করে তুলেছেন। কিন্তু এর মধ্যেও কিছুদিন আগে একটি চমৎকার ‘রাজনৈতিক বাণী’ দিয়ে ফেলেছেন।

গত জানুয়ারিতে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয় পার্টির (জেপি) ত্রিবার্ষিক কাউন্সিলে অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে ভালোমানুষ আসতে চায় না। আমরা রাজনীতিকরা রাজনীতিকে ভালোমানুষের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলতে পারিনি। যে কারণে আজ ভালোমানুষ এবং শিক্ষিত, সৎ ও যোগ্য মানুষ রাজনীতির ধারেকাছেও নেই। একই অবস্থা ছাত্র রাজনীতিতেও।’ (সমকাল, ৮ জানুয়ারি ২০২৩)।

ওবায়দুল কাদেরের এ বক্তব্যের সঙ্গে কেউ দ্বিমত করবে না। তিনি খুবই সত্য ও বাস্তব কথা বলেছেন। বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা যখন এমন উপলব্ধিতে পৌঁছেন এবং সে অনুযায়ী বক্তব্য দেন, সামগ্রিক রাজনীতিতে এর তাৎপর্য ব্যাপক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে– কারা রাজনীতিকে অনাকর্ষণীয় করে তুলছে? কারা নষ্ট করেছে রাজনীতি?

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর নিবন্ধে প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। বড় প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন– ‘আমাদের রাষ্ট্রের পত্তনটা ঘটেছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে, তখন এর চরিত্র স্বভাবতই ছিল আমলাতান্ত্রিক। পাকিস্তানি শাসনামলে সেই চরিত্রে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, কারণ শাসকদের অভিপ্রায় ছিল পূর্ববঙ্গকে তাদের উপনিবেশে পরিণত করা।... আমরা চেয়েছিলাম সেই পাকিস্তান থেকে বের হয়ে গিয়ে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে; সম্ভব হয়নি। কারণ বাঙালি জাতীয়তাবাদীরাও ছিলেন পাকিস্তানি শাসকদের মতোই রাষ্ট্রের পুঁজিবাদী ও আমলাতান্ত্রিক চরিত্রটি অপরিবর্তিত রাখতে বদ্ধপরিকর।’

বর্তমান আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক দলের ‘ব্যস্ত’ সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো পাণ্ডিত্যপূর্ণভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের আমলাতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী চরিত্র সম্পর্কে স্টাডি করার সময় পাবেন– এটা আমি প্রত্যাশা করি না। কিন্তু তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটার কারণ কি আন্তরিকভাবে খোঁজার চেষ্টা করবেন? বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ বা প্রতিকারের লক্ষ্যে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের নতুন লড়াই শুরুর কথা কি তিনি কখনও ভাবেন? নাকি বিদ্যমান রাজনীতি বিষয়ে একটা ‘মহৎ বাণী’ দিয়ে সবার প্রশংসা পাওয়াই তাঁর আসল লক্ষ্য?

আমি মনে করি, বর্তমানে রাজনীতি যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে; ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় যে রাজনীতিতে ‘ভালোমানুষ’ আসতে চাইছে না; সেই রাজনীতির দায় তাঁর দল আওয়ামী লীগকে বহুলাংশে নিতে হবে। কারণ টানা তিন মেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রেখেছে দলটি। শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা নয়; দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরগুলোও এখন ক্ষমতাসীন দল ও তাদের নানা ধরনের সমর্থক গোষ্ঠীর দখলে। এর মধ্যে যদি রাজনীতি খারাপ হয়ে যায়; ভালোমানুষের আসার পরিস্থিতি না থাকে, তাহলে দায় কার?  

গত দেড়-দুই দশকে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে নষ্ট রাজনীতি ও নষ্ট মানুষ এবং নষ্ট সব সংস্কৃতি, অমানবিকতা ও নানা বেআইনি কাজকারবার কীভাবে সবকিছু সমানে গ্রাস করে নিচ্ছে, এর কিছু নমুনাও উল্লেখ করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী কি সেসব আমলে নেবেন? অভিজ্ঞ রাজনীতিক ওবায়দুল কাদের কি সেসব দেখতে পান না? তিনি কি জানেন না, কীভাবে প্রশাসনের স্তরে স্তরে দুর্নীতি হচ্ছে? কীভাবে এলাকায় এলাকায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নামে চাঁদাবাজি, ঠিকাবাজি চলছে? সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, একটি মহল নিজের বা নিজের রাজনৈতিক গোষ্ঠীগত উন্নয়নকেই ‘দেশবাসীর উন্নতি’ বলে বিশ্বাস করছে। ক্ষমতাসীন দলের চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নিবন্ধটি যেদিন ছাপা হয়েছে, সেদিনই এই সংবাদপত্রের তৃতীয় পৃষ্ঠায় একটি খবর ছাপা হয়েছে। শিরোনাম– ‘ভর্তিচ্ছুদের ফুল দিতে এসে হামলার শিকার ছাত্রদল’। সচিত্র ওই সংবাদে দেখা যাচ্ছে, দু’জন সহশিক্ষার্থী অন্য এক আহত ও রক্তাক্ত ছাত্রকে ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালের উদ্দেশে। এরা ছাত্রদল কর্মী। খবরে বলা হয়েছে, ‘ছাত্রদলের ভাষ্য, তারা ক্যাম্পাসে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানায়। শিক্ষা চত্বর-সংলগ্ন কার্জন হলগেটে ফুল দিয়ে হাইকোর্টের দিকে ফেরার পথে ছিল তারা, মোটরসাইকেলে এসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এইসব ছাত্রদল কর্মীর ওপরে হামলা চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির ও সাধারণ সম্পাদক তানভির হাসানের নেতৃত্বে এ হামলা হয়।’ (সমকাল, ৭ মে ২০২৩)।

ওই হামলায় অন্তত ছয়জন ছাত্রদল নেতা আহত হয়। তাদের একজন সাব্বিরের মাথায় ১২টি সেলাই লেগেছে। তারা কাকরাইলের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়েছে। এই যে ঘটনাটি ঘটাল, এর কী জবাব দেবেন ওবায়দুল কাদের?

ক্ষমতাসীন দল যখন মাস্তান পুষবে; বিরোধী দল দমনে পুলিশকে ব্যবহার করবে; দলীয় কর্মীদের দিয়ে বিরোধী দল ও মতের লোকজনের ওপরে যখন তখন হামলা করবে; এমনকি নিজ দলের ভিন্নমতের কর্মীদেরও ছাড় দেবে না; তখন নষ্ট রাজনীতি দূর হয়ে সুস্থ রাজনীতি কীভাবে কায়েম হবে?

খায়রুল কবীর খোকন: বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, সাবেক সংসদ সদস্য ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক

আরও পড়ুন

×