ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

এত ডিম কোথায় গেল?

এত ডিম কোথায় গেল?
×

রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

‘ডাল যদি গরিবের মাংস হয়, ডিম তবে খাসির রেজালা!’ ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে এ স্ট্যাটাসটি সামনে পড়ল। স্ট্যাটাসটি বেশ ভাবিয়ে তুলল। দাম বাড়তে বাড়তে একেবারে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে গরিবের ‘বন্ধু’ ডিম! গত এক সপ্তাহে খুচরা পর্যায়ে ডিমের দাম প্রতি ডজনে ২০ থেকে ৩৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ডিমের এত মূল্যবৃদ্ধি দেখে চোখ কপালে উঠল। পাড়া-মহল্লার ভেতরের দোকানগুলোতে কোথাও কোথাও ডিম বিক্রি হচ্ছে প্রতি ডজন ১৭৫ টাকায়। এর আগেও কয়েক দফা বেড়েছে ডিমের দাম। এই বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের দাম প্রতি ডজনে ৩০ টাকা বেড়েছিল। গত বছরের আগস্টের দিকেও এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২০-২৫ টাকা বেড়েছিল। ডিমের দামের লাগাম টেনে ধরার কি কেউ নেই! অথচ দেশের বিভিন্ন সাফল্য ও উন্নয়নের খবর নিয়মিত মোবাইল ফোনের মেসেজ বক্সে পাচ্ছি।

দু’দিন আগের কথা। সকালে ঘুম থেকে উঠে তড়িঘড়ি অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। এমন সময় মোবাইল ফোনে আওয়াজ হলো। ফোন হাতে নিতেই দেখলাম, ‘এই সরকারের সাফল্য (কিছুটা পরিমার্জিত): ২০০৬ সালে পোলট্রির সংখ্যা ছিল ১৮ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার। বর্তমান সরকারের সময়ে তা দাঁড়িয়েছে ৫২ কোটি ৭৯ লাখ ১৯ হাজারে।’ এখন প্রশ্ন হলো, ২০০৬ থেকে ২০২৩– এই ১৭ বছরে পোলট্রি ব্যবসায়ের এত উন্নয়ন ঘটা সত্ত্বেও ডিমের বাজারে এত ‘আগুন’ কেন? কেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে এর দাম? পোলট্রি খামার, পোলট্রি ব্যবসায়ের এত অগ্রগতির এই সময়ে ডিমের দাম তো একবারে সাধ্যের মধ্যে থাকার কথা।

গরিব, হতদরিদ্র, নিম্ন আয়ের মানুষের প্রোটিন ও বায়োটিনের চাহিদা পূরণের অন্যতম উৎস হলো ডিম। ব্যাচেলর নারী-পুরুষের জন্যও ডিম আশীর্বাদ। কেননা, কোনো বেলায় খাওয়ার কোনো কিছু না থাকলে ডিম সেদ্ধ করে কিংবা ডিম ভেজে ভাতের সঙ্গে খেয়ে ফেলা যায়। শুধু নিম্ন ও সাধারণ আয়ের মানুষের কথা বললে ভুল হবে; মধ্যবিত্তরাও ‘বাজারের আগুনে’ হাঁপিয়ে উঠছে। কিছুদিন আগে পাশের বাসার এক বড় আপার সঙ্গে কথা বলতে প্রসঙ্গক্রমে এলো ডিমের কথা। তিনি অকপটেই জানান, আগে প্রতিদিন সবার (পাঁচ সদস্য) জন্য ডিম সেদ্ধ করলেও গত এক-দেড় বছরে তা চাইলেও করতে পারেন না। এখন সেদ্ধ ডিম খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। একটি ডিম দুই ভাগ বা চার ভাগ করে বাচ্চাদের টিফিনে দেন। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে পুষ্টি চাহিদা কীভাবে পূরণ হবে! এদিকে চিকিৎসকরা বলেন, শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ডিম খুব কার্যকর। হাড় শক্ত করতেও ডিম উপকারী। কেননা, ডিমে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন ডি। একই সঙ্গে ডিমে আছে ভিটামিন এ, যা দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। অনেক পুষ্টিবিদ ও ডায়েটিশিয়ান প্রতিদিন সকালে একটি ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। একটি দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ মানুষ যেখানে হতদরিদ্র, সেখানে কী করে রোজ একটি ডিম (প্রতি হালি ৬০ হলে একটির দাম ১৫ টাকা) একজন ব্যক্তি খাবে! পরিবারে যদি পাঁচ-ছয়জন সদস্য থাকে, তাহলে খরচ পড়ে কত!

আগের তুলনায় বেড়েছে খামার ও খামারির সংখ্যা, তাহলে এখন কেন ডিম ভোক্তার নাগালের বাইরে যাচ্ছে! এর পেছনে নিশ্চয় কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে। এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সিন্ডিকেটের কিছু করতে না পেরে সমাধান দিচ্ছেন আমদানিতে। অন্যদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম আমদানিতে সায় না দিয়ে ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে বাজার বিন্যাসের ওপর জোর দেওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর কথায় যদি ডিম আমদানি না করা লাগে, তাহলে ধরে নেওয়া যায়, দেশেই পর্যাপ্ত ডিম আছে। যদি তা-ই হয়, হঠাৎ ডিমের দাম চড়া কেন! নেপথ্যের গল্পটা কী?

রিক্তা রিচি: কবি ও সংবাদকর্মী

আরও পড়ুন

×