ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

মেধাবীর আত্মহত্যার মিছিল

মেধাবীর আত্মহত্যার মিছিল
×

রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

একটি খবরে স্তব্ধ হলাম। বিষণ্ণতায় ভুগে ঢাকা মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা করেছেন। নাম জয়া কুণ্ডু। এই সপ্তাহে আরও দুটি আত্মহত্যার খবর পাওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ঋতু কর্মকার নিপার আত্মহত্যা; অন্যটি মিরপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার সায়েন্সের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আফরোজা আক্তারের। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই এমন খবরে চমকে উঠি; স্তব্ধ হই। জীবন কি তবে কেবলই হতাশার ঝাঁপি; চোখের জল?

 গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে চোখ রাখলে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। বুয়েট, ঢাকা মেডিকেলসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে এই তালিকায়। সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২২ সালে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ৫৩২ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ৪৪৬ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৮৬ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। ২০২১ সালে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আত্মহননকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০১; ২০২০ সালে ৪২; ২০১৯ সালে ৫৬; ২০১৮ সালে ১১; ২০১৭ সালে ১৯। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (২০২২ সালের) তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর আত্মহত্যা করে ১৩-১৪ হাজার মানুষ।

কেনই বা অসংখ্য স্বপ্নের অকালমৃত্যু? কারণ হিসেবে দেখা যায় বিষণ্নতা, হতাশা, চাকরি না পাওয়া, অভাব-অনটন, প্রেমে প্রতারণা। অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের মানসিক ধাক্কা। আরও স্পষ্টভাবে বলতে হয় আত্মহত্যার পেছনে দায়ী বিষণ্ণতা নামের ঘুণপোকা। কখনও কি খোঁজা হয়েছে– কেন এই বিষণ্নতা? খুব সহজ করে বলতে গেলে বিষণ্নতার কারণ হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এ মাধ্যমে কেউ মালদ্বীপ বা অন্য কোনো দেশ ভ্রমণের ছবি দিচ্ছেন, কেউ আবার ভালো মানের রেস্টুরেন্টে খাবার খাওয়ার ছবি এবং অনেক আনন্দঘন মুহূর্তের ছবি দিচ্ছেন। প্রচার করছেন নিজের সাফল্যের গর্ব। এসব দেখে অনেকের মধ্যেই না পাওয়া ও অভাববোধ বেড়ে যায়। বেড়ে যায় হতাশা, যা ধীরে ধীরে বিষণ্নতায় রূপ নেয়।

সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য একজন মানুষকে দুই থেকে তিন বছর ‘যুদ্ধ’ করতে হয়। বারবার ভাইভা বোর্ড থেকে প্রত্যাখ্যান নামের ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত হয়ে ফিরতে হয়। গাধার খাটুনি খেটে বারংবার চেষ্টা করার পরও কেউ কেউ নির্দিষ্ট বয়সসীমার মধ্যে চাকরি পান না। কেননা, বিভিন্ন সেক্টরে চাকরিপ্রার্থীর তুলনায় আসন সংখ্যা অতি নগণ্য। তার ওপর কাঁটা হয়ে আছে বয়সসীমা। নেই চাকরির নিরাপত্তা। জীবন তো নানা সমস্যায় জর্জরিত। পুরো একটা জীবনে সুখকর সময় যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে দুঃখের সময়ও। সেই কাঠ-খড় পোড়ানোর মতো আত্মশক্তি ও বিশ্বাস তো থাকতে হবে। কাছের মানুষের উচিত তার হৃদয়পানে চাওয়ার; তার ক্ষত ও ব্যথায় হাত বুলানো। তাকে বারবার বিশ্বাস করাতে হবে– ব্যর্থ হওয়া মানেই শেষ নয়। যেখানে শেষ, সেখান থেকেই শুরু হতে পারে।

পরিবার অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানের ডিপ্রেশন তথা বিষণ্নতার জন্য দায়ী। অধিকাংশ বাবা-মা অন্যের সন্তানের সঙ্গে বিভিন্নভাবে তুলনার মাধ্যমে নিজের সন্তানকে অবহেলা করেন। তারা সন্তানকে পড়াশোনা, চাকরি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ‘প্রতিযোগিতা’র মধ্যে ফেলে দেন। আর এসব ‘প্রতিযোগিতা’, ‘তুলনা’ থেকে রাগ, অভিমান, অভাববোধের জন্ম হয়। তুলনা একজন মানুষকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়। তাই অভিভাবকের উচিত বিষণ্নতায় ভোগা সন্তানের মনের প্রতি যত্নশীল হওয়া। তার মন খারাপের কারণ চিহ্নিত করা। সেটি কি শুধুই মন খারাপ, নাকি ভয়ানক বিষণ্নতা; তার খবর নেওয়া। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্যের পরামর্শকের কাছে নিয়ে যাওয়া। ধীরে ধীরে তাকে সুস্থ করে তোলার প্রয়াস চালাতে হবে কাছের মানুষকেই। ‘এ জীবন নিত্যই নতুন’– এই বোধ বিষণ্নতায় ভোগা ব্যক্তির মধ্যে গড়ে তুলতে হবে পরিবার, বন্ধু ও কাছের মানুষদেরই।   

রিক্তা রিচি: কবি ও সংবাদকর্মী

আরও পড়ুন

×