অন্যদৃষ্টি
ঘরবন্দি করার শাস্তি এখনও চলবে?
রিক্তা রিচি
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার তালম ইউনিয়নের গাবরগাড়ি গ্রামে দুই নারীকে ঘরবন্দি করা হয়েছে। পরিবারসহ তাদের সমাজচ্যুত করা হয়েছে। চরিত্রে ত্রুটি আছে– এমন অভিযোগ এনে দুই নারীকে দোষী সাব্যস্ত করে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রথম কথা হলো, গ্রামের কর্তাপুরুষেরা কি আদালত– তারা শাস্তি ও জরিমানা নির্ধারণ করবেন? এটা কি আইন হাতে তুলে নেওয়া নয়?
খবরটি ছাপা হয়েছে ২৫ সেপ্টেম্বরের সমকালে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, মেয়ে দুটির বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে বলা হয়েছে, তারা নাকি রাত করে বাড়ি ফেরেন। আবার মাঝেমধ্যে যেখানে সেখানে বেড়াতে যান। একজন মানুষ, বিশেষ করে নারী তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক অথবা অন্য কোনো কাজে বাইরে গেলে তা সমাজের এক শ্রেণির মানুষের চোখে ‘কাঁটা’ হয়ে যায়!
‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’– পুরুষশাসিত সমাজে এ প্রবাদটিই যেন নারীর জন্য যথোপযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। নারী যা করতে চায়, তাতেই এক দল লোক ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কীভাবে নারীকে সমাজ ও দেশের কাছে হেয় করা যায়; কীভাবে সবার সামনে অপমান করা যায়; কীভাবে হেস্তনেস্ত করে তার আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করে সমাজে অবদমিত করে রাখা যায়– এ যেন পুরুষশাসিত সমাজের এক দল ঘুণে ধরা মস্তিষ্কের চিন্তা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সাক্ষরতার হার, জীবনযাত্রার মান– সব দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ; এগিয়ে যাচ্ছে সমাজ। নারী শ্রমজীবীরা দিনরাত পরিশ্রম করে নিজ নিজ পরিবারকে টিকিয়ে রাখায় সাহায্য করেন পুরুষের পাশাপাশি। এই উপার্জন না থাকলে কী হতো তাদের সন্তানদের এবং কী হতো দেশের অর্থনীতির? সমাজের অভিভাবকদের তো দেখা যায় না অভাবে পড়া মানুষ কিংবা নিপীড়িত নারীদের পাশে দাঁড়াতে। কেবল তারা স্বাবলম্বী হলেই তাদের টনক নড়ে!
যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার নারী; যে দেশের নারীরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন; যে দেশের নারীরা পোশাক থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন; সে দেশেরই এক জেলার দুই নারীকে রাত করে বাড়ি ফেরার কারণে সমাজচ্যুত করা হয়েছে। এ কেমন কথা!
আমরা একটি স্বাধীন দেশে বাস করি। অথচ এখানে পদে পদে পরাধীনতার শিকল। ঘরে-বাইরে সব জায়গায় যেন অদৃশ্য নিয়মের জাল। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি পুরুষ হয়, আর অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে (নারী) অবদমিত করে রাখা, তাদের আত্মবিশ্বাসকে ভেঙে চূর্ণ করে দেওয়ার জন্য পুরুষশাসিত হিংস্র চিন্তাই যথেষ্ট।
আমরা যতই এগিয়ে যাই না কেন; চিন্তার জায়গা থেকে এগোতে পারিনি। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ নারীকে, তার অবদানকে টেনে নিচে নামাতে ধর্মের দোহাই দেয়; ধর্মের অপব্যবহার করে। নবী করিম (সা.)-এর স্ত্রী খাদিজা সেই সময়ে ব্যবসা করতেন। অথচ এই সময়ে এসে ক্রিকেটার তানজিম হাসান সাকিবরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দেন– নারীরা চাকরি করলে স্বামী-সন্তানের হক আদায় হয় না; পরিবার ধ্বংস হয়, সমাজ নষ্ট হয়! একজন সেলিব্রিটিকে দেখে সাধারণ মানুষ ভালো-মন্দের শিক্ষা নেয়, উদারতা শেখে। সেই সেলিব্রিটি যদি নারীর চাকরি করাকে সমর্থন না করেন, তাকে অধস্তন করার চিন্তা ভেতরে পুষে রাখেন, তাহলে এই সমাজ, তরুণ প্রজন্ম তাঁর কাছ থেকে কী শিখবে?
বিদ্বেষ, অন্যকে দমিয়ে রাখা, নারীকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে না দেওয়া– মোটকথা নারীকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করা এবং নারীকে মানুষ হিসেবে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করা কোনো কৃতিত্ব নয়; বরং সংকীর্ণতা। কোনো নারীকে অসম্মান করা মানে হলো ঘরের মা, স্ত্রী ও বোনকে অসম্মান করা। সিরাজগঞ্জের দুই নারীকে গৃহবন্দি করা, সমাজচ্যুত করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেওয়া মধ্যযুগীয় বর্বরতা, নারীবিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। এর সব কিছুই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমরা আশা করি, কর্তৃপক্ষ এর একটা বিহিত করবে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- রিক্তা রিচি
