ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মাতৃত্ব

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীকে হেয় করা বিধিমালা?

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীকে হেয় করা বিধিমালা?
×

সোলায়মান তুষার

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. দীপিকা রানী সরকার স্বাক্ষরিত এক নোটিশে গত ২৫ সেপ্টেম্বর জানানো হয়, ‘আবাসিকতা লাভ ও বসবাসের শর্তাবলি এবং আচরণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা ২০২১-এর ১৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিবাহিত ও গর্ভবতী ছাত্রীরা আবাসিক সিট পাবে না বিধায় তারা অতিদ্রুত হলের সিট ছেড়ে দেবে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ প্রশাসনের নির্দেশেই তিনি এমন ফরমান জারি করেছেন। কিন্তু মুশকিল হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ধরনের নোটিশ শুধু সংবিধানবিরোধী নয়; নারীর প্রতি অবমাননাকর ও বিদ্বেষমূলক।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। হলের নামকরণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের নামে। বঙ্গবন্ধু সারাজীবন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর পাশে ছিলেন সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রীর নামে করা হলটিতে ‘বিবাহিত ও গর্ভবতী’ ছাত্রীদের প্রতি যে অবজ্ঞামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তা কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য নয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. দীপিকা রানী সরকার সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, বিবাহিত শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব তাদের স্বামীরা নিতে পারেন। বড় বড় জায়গায় চাকরি করেন, তারা চাইলেই তাদের স্ত্রীকে অন্য জায়গায় রাখতে পারেন।

নারীরা বিবাহিত হলেই সবার স্বামী বড় বড় জায়গায় চাকরি করবেন, এমন নয়। কার স্বামী বিত্তশালী, কার স্বামী বিত্তশালী নন, তা বিবেচনা করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নয়। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিট বণ্টন হবে মেধার ভিত্তিতে। এখানে কে অবিবাহিত, কে বিবাহিত, কে অন্তঃসত্ত্বা, তা বিবেচনার সুযোগ নেই। কোনো শিক্ষার্থী রাতে মাতৃত্বজনিত সমস্যার মুখোমুখি হলে তা সমাধানের ব্যবস্থাও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যমূলক বিধানের ফলে কার্যত বিবাহিত ও অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রীরা হলের আবাসিক সুবিধা গ্রহণ করে উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান’ এবং ২৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। (২) রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ধরনের বিধান বা নোটিশ নারীদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথে অন্তরায় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিবাহিত ও অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রীদের সম্পর্কে যে বিধান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ করেছে, তা সংবিধানের ২৮(৩) অনুচ্ছেদের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন।’ সে ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নীতি করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতি সুযোগের অসমতা সৃষ্টি করেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিবাহিত ও অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রীদের সামাজিকভাবেও হেয় করেছে। তাদের হলে অবস্থান করা নিয়ে বিধিনিষেধ দেওয়ায় তাদের অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। কেননা, ঢাকা শহরের যে কোনো জায়গায় বাসা ভাড়ার চেয়ে হলে অবস্থান করা সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় রাষ্ট্র তথা জনগণের টাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে ছাত্রী বা নারীরা সরাসরি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংবিধানের ১৯(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। কেননা, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিবাহিত ও অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রীদের সমান সুযোগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় বিধিমালার শর্তের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতায়ও হস্তক্ষেপ করছে।

সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ কোনো নরনারী বিয়ের উপযুক্ত হলে বিয়ে করবেন কি করবেন না, সেটা তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতা। শর্তের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিয়ে ও সন্তান ধারণকে অনুৎসাহিত করেছে।

স্বাধীনতার ৫২ বছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবিধানবিরোধী বিধিমালা কেন– সেটিই বড় প্রশ্ন। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক বিধান করা হবে– তা মেনে নেওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বৈষম্যমূলক নীতিটি অচিরেই বাতিল করে সব ছাত্রীর জন্য একটি সর্বজনীন নীতি প্রণয়ন করবে– এটাই সবার কাম্য। সেই সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রীদের জন্য রিজনেবল অ্যাডজাস্টমেন্ট বা যুক্তিসংগত সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। ক্লাস ও পরীক্ষা চলাকালীন যেসব ছাত্রী মা হয়েছেন, তাদের সন্তান রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপযুক্ত স্থান সৃষ্টি করতে হবে। অবশ্যই ছাত্রী হলে সর্বক্ষণ ডাক্তার ও নার্স রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সে ব্যবস্থা করবেন না বলে বা তেমন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারেননি বলে একটি বিধান জারি করে দেবেন, তা হয় না। এ জন্যই বলা হয়, শিক্ষককেও শিক্ষিত হতে হয়। ব্যারিস্টার সোলায়মান তুষার: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক আইনের গবেষক

আরও পড়ুন

×