ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

তাবলিগ জামাত

ভাতৃঘাতী বিরোধ বন্ধ করুন

ভাতৃঘাতী বিরোধ বন্ধ করুন
×

প্রতীকী ছবি

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০০:৫০

টঙ্গীর তুরাগতীরের বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের ‘দখল’ লইয়া তাবলিগ জামাতের দুই অংশের সংঘর্ষে চারজনের প্রাণহানি অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক। ধর্মীয় প্রচারাভিজানের মাধ্যমে শান্তি ও কল্যাণের বাণী প্রতিষ্ঠাই যাহাদের ব্রত, তাহাদের মধ্যে এইরূপ রক্তপাত হতাশাজনক। ভারতের দিল্লিতে প্রায় শত বৎসর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত তাবলিগ জামাতের মধ্যকার দ্বন্দ্বে বাংলাদেশে কয়েক বৎসর পূর্বে সংগঠনটি দুইভাবে বিভক্ত হইয়া পড়িলেও বিভক্তি সারাইবার পরিবর্তে ফাটল যে বিস্তৃত হইয়াছে, বুধবারের এত প্রাণহানিই তাহার প্রমাণ। এই অঘটনে বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের দুইটি অংশ ‘জুবায়ের’ ও ‘সাদ’পন্থি পরস্পরকে দোষারোপ করিতেছেন। আমরা মনে করি, উভয় পক্ষই দায় এড়াইতে পারেন না। একইসঙ্গে যেইখানে সংঘর্ষ বাধিবার শঙ্কা ইতিপূর্বেই ছিল, সেইখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন সতর্ক ছিল না? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাসময়ে তৎপর হইলে প্রাণহানি নিঃসন্দেহে এড়ানো যাইত। ভাতৃঘাতী এই বিরোধ বন্ধ করিতেই হইবে।

আমরা দেখিয়াছি, ২০১৮ সালেও তাবলিগ জামাতের সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়াছিল। ইহার পর দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হইয়াছিল এবং প্রতিবৎসরের প্রারম্ভেই দুই পক্ষ ভিন্ন দুইটি সপ্তাহে বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতেমা পরিচালনা করিয়া আসিতেছে, যেইখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হইতে ধর্মপ্রাণ মানুষ অংশগ্রহণ করিয়া থাকে। ৫ আগস্টে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আমরা দেখিয়াছি, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সাদপন্থিদের ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়া নিষিদ্ধের দাবিতে সমাবেশ করেন তাবলিগের জোবায়েরপন্থিরা। সাদপন্থিরাও পরে অনুরূপ সমাবেশের ডাক দিলে জোবায়েরপন্থিদের হুমকিতে সরকারের হস্তক্ষেপে অবশেষে উহা বাতিল করা হয়। তবে উভয়পক্ষই একে অপরকে ঠেকাইতে যে বেপরোয়া তাহা স্পষ্ট। হতাশাজনক হইলো, এত প্রাণহানির পরেও উহাদের কোনো পক্ষের মধ্যেই ছাড় দিবার মানসিকতা দৃশ্যমান হইতেছে না।

বুধবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা তাবলিগের দুই পক্ষের সহিতই বসিয়াছেন। হতাহতের ঘটনায় টঙ্গীর ইজতেমা মাঠ ঘিরিয়া রাখিয়া সকল ধরনের সভা, সমাবেশ, মিছিল ও জমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষণা করিয়াছে পুলিশ। তিনি প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। আমরা মনে করি, অপরাধীর বিচার অবশ্যই করিতে হইবে। একইসঙ্গে তাবলিগের দুই পক্ষ যাহাতে আর সংঘর্ষে না জড়াইতে পারে, সেই সমঝোতা বিধানের জন্যও সরকারকে তৎপর হইতে হইবে। তবে এই ক্ষেত্রে তাবলিগের উভয়পক্ষেরই সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা জরুরি। তাবলিগ জামাতের উভয়পক্ষকেই বুঝিতে হইবে যে, তাহারা সমঝোতায় না পৌঁছাইলে এই ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটিতেই থাকিবে। তাহাদের স্মরণে রাখিতে হইবে, ইতিমধ্যে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনায় দেশে ও বিদেশে তাবলিগ জামাতের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হইয়াছে। এখনও যদি তাহারা সমঝোতার পথ অবলম্ব না করে দীর্ঘ মেয়াদে উভয় পক্ষই গ্রহণযোগ্যতা হারাইবে।

নূতন বৎসরে তাবলিগের দুই পক্ষেরই বিশ্ব ইজতেমা হইবার কথা রহিয়াছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ইতিমধ্যে বলিয়াছেন, সরকার চায় উভয়পক্ষ আলোচনা করিয়া সমাধানের পথে আসুক। আমরাও মনে করি, ইহা তাবলিগের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং নিজেদেরই এই সমস্যার সমাধান করিতে হইবে। তাহাদের এই বিরোধ চলিতে থাকিলে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হইবে না একইসঙ্গে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষও বিভ্রান্ত হইবে। আরও গুরুতর বিষয়, এই বিরোধ কাজে লাগাইয়া তৃতীয় পক্ষ তৎপর হইয়া উঠিতে পারে। তাবলিগ জামাতের যেই অহিংস চরিত্র আমরা দেখিয়া আসিয়াছি, উহা বজায় রাখিতে না পারিলে সাংগঠিনক কর্ম যদ্রুপ ব্যাহত হইবে, তদ্রুপ সামাজিক সংকটও বাড়িবে বৈ কমিবে না। তাবলিগের উভয়পক্ষের মুরুব্বিরা বিষয়টি যত দ্রুত বুঝিবেন ততই মঙ্গল।

আরও পড়ুন

×