হামজনিত প্রাণহানিতে সিলেট দ্বিতীয়
পুষ্টি ও প্রতিষেধকের বিকল্প নাই
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাম ও হামের উপসর্গ লইয়া সিলেটে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পাইয়াছে বলিয়া গতকাল বুধবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন হইতে যাহা জানা যাইতেছে, তাহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। বস্তুত গত জানুয়ারিতে হামের প্রাদুর্ভাবের সময় সেখানে মৃত্যুসংখ্যা কম থাকিলেও বর্তমানে এই দিক দিয়া শীর্ষে অবস্থানকারী ঢাকার পরেই সিলেটের অবস্থান। তবে দেশে হামের ন্যায় প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে কেন ইতোমধ্যে আট শতাধিক শিশুর প্রাণহানি ঘটিল– সিলেটের চিত্রটি বিশ্লেষণ করিলে উহারও উত্তর মিলিতে পারে। প্রতিবেদনমতে, টিকা সংকট ও অপুষ্টিহীনতার কারণেই সিলেটে হামে শিশুর প্রাণহানি বাড়িয়াছে। অর্থাৎ আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, টিকাদান কর্মসূচি এবং শিশুপুষ্টি ব্যবস্থার দুর্বলতারই মারাত্মক প্রতিফলন ঘটিতেছে সিলেটে।
আমরা জানি, হাম প্রতিরোধে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন সফল ছিল। তবে অকস্মাৎ এই বৎসর হাম ও উহার উপসর্গে শিশুমৃত্যু বৃদ্ধি পাইলেও উহার পটভূমি সৃষ্টি হয় আরও পূর্বে। গত দুই বৎসর হামের টিকাদানে ছেদ পড়িবার প্রভাব হিসাবে এই বৎসর হাম ও উহার উপসর্গে শিশুমৃত্যু বৃদ্ধি পাইয়াছে। তবে সিলেটে প্রাণহানি বৃদ্ধির ঘটনায় শিশুর অপুষ্টির বিষয়ও সম্মুখে আসিয়াছে। পুষ্টিহীনতায় শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হইবার কারণে কেবল হাম নহে, যে কোনো সাধারণ রোগও প্রাণঘাতী হইয়া উঠিতে পারে। সিলেটে শিশুদের উদ্বেগজনক পুষ্টিহীনতা ইতোপূর্বে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনেও উঠিয়া আসিয়াছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সমস্যাটি সমাধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয় নাই। বলিয়া রাখা প্রয়োজন, অপুষ্টির কারণে শিশুর স্বাভাবিক দৈহিক-মানসিক বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হয়, যাহা পরবর্তী জীবনে শিশুর জন্য মারাত্মক ভোগান্তির কারণ হইয়া দাঁড়ায়। এই কারণে এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে শিশুটি পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্যও বোঝায় পরিণত হয়। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেই আমরা দেখিয়াছি, পুষ্টিহীনতার কারণে খর্বতায় ভুগিতেছে দেশে প্রতি চার শিশুর একজন।
এহেন পরিস্থিতিতে সিলেটে কেবল হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দিয়া সমস্যার সমাধান হইবে না। বরং জরুরি ভিত্তিতে সিলেটসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ টিকাদান অভিযান পরিচালনা করিতে হইবে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শনাক্ত করিয়া পুষ্টি সহায়তা দেওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। শুধু সিলেটে নহে; বস্তুত সমগ্র দেশের শিশুদের পুষ্টিহীনতার বিষয়ে সরকারকে নজর দিতে হইবে। শিশুর পুষ্টির সহিত মাতৃদুগ্ধের ভূমিকা ব্যাপক। অথচ অনেক শিশুই মাতৃদুগ্ধ পায় না। তজ্জন্য মায়ের অপুষ্টির বিষয়ও আমলে লইতে হইবে।
প্রত্যেক শিশুই অমিত সম্ভাবনার আধার। তাই শিশুর মৃত্যু কেবল পরিবারের নহে, জাতিরও অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মনে হইতেছে না, সংশ্লিষ্ট সকলে বিষয়টির গুরুত্ব যথাযথ উপলব্ধি করিতে পারিতেছে। এই বৎসর যেইভাবে সারাদেশে হাম ও উহার উপসর্গে শিশুর প্রাণহানি হইয়াছে, উহার পশ্চাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের ব্যর্থতাও দায়ী বলিয়া জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অনেকে অভিযোগ করিয়াছেন। বিষয়টি আমলে লইয়া সরকারকে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। টিকার সহজপ্রাপ্যতা পূর্ণাঙ্গভাবে নিশ্চিতকরণ, তৎসহিত শিশুর পুষ্টিহীনতা প্রতিরোধ করিতে ব্যর্থ হইলে ভবিষ্যতেও এহেন করুণ মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হইবে। সরকার গৃহীত হামের টিকা কর্মসূচিরও পুনর্বিন্যাস দরকার বলিয়া আমরা মনে করি। সিলেটসহ সমগ্র দেশে শিশুদের হামের টিকা নিশ্চিতকরণে স্বাস্থ্য প্রশাসনের তদারকি ও তৎপরতা জরুরি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করিতে হইবে যাহাতে কোনো শিশু হামের টিকার বাহিরে না থাকে। অভিভাবকদের মধ্যেও টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে আস্থা তৈয়ার করা জরুরি।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়