ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

সরকারি এমপিদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ

অগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক

অগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইউনিয়ন পরিষদ তথা ইউপি নির্বাচনকে সম্মুখে রাখিয়া স্থানীয় সরকার বিভাগ বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের বাদ দিয়া শুধু ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের (এমপি) যে বিশেষ বরাদ্দ দিয়াছে, তাহা দুর্ভাগ্যজনক। শনিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর অভিপ্রায়ে ২০৩টি আসনে সংসদ সদস্যরা যেন তাহাদের পছন্দের প্রকল্প বাস্তবায়ন করিতে পারেন, তজ্জন্য ৫১ কোটি ১৮ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হইয়াছে, যাহা আগামী বৎসর ৩০ জুনের মধ্যে ব্যয় করিতে হইবে। অন্যদিকে, গত সোমবার নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে, ইউপি নির্বাচন পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত হইবে ২১ জানুয়ারি হইতে ২৭  মে পর্যন্ত। স্পষ্টত, এহেন বরাদ্দের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদসমূহে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের অনাকাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো করা হইল, আসন্ন ইউপি নির্বাচনে যাহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িবে। শুধু উহাই নহে, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হইয়াছেন– এমন আসনের ইউনিয়নসমূহ এই বিশেষ বরাদ্দ হইতে বঞ্চিত হইবার ফলে বিরোধী পক্ষের প্রতি সরকারের বৈষম্যমূলক মনোভাবও উৎকটরূপে প্রকাশিত হইল।

আমরা জানি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের যে কোনো কার্যক্রমে সংসদ সদস্যদের খবরদারিতে প্রায় সর্বমহলেই আপত্তি রহিয়াছে। ইতোপূর্বে ইহার বিরুদ্ধে উপজেলা ও ইউপি পর্যায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বহু আন্দোলনও করিয়াছেন। উপরন্তু যে কোনো নির্বাচনকে সম্মুখে রাখিয়া সংশ্লিষ্ট এলাকায় সরকারি অনুদান বা বিশেষ বরাদ্দ নৈতিকতার বিচারেও অগ্রহণযোগ্য। ফলে উক্ত বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে কেবল সেই আপত্তিকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা হইতেছে না; বহুবিধ রাজনৈতিক সংকটেরও জন্ম হইতে পারে। প্রথমত, এই বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের উপর স্থানীয় সংসদ সদস্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কারণে সংশ্লিষ্ট ইউপিসমূহে তিনি মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করিতে পারিবেন; এমনকি তাহা নির্বাচন প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করিলে বিস্ময়ের কিছু থাকিবে না। ইহার ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সরকারি দলের মধ্যে উপদলীয় সংঘাত বৃদ্ধি পাইবে এবং নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হইলে সরকারেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হইতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিরোধীদলীয় ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের এই বরাদ্দ হইতে বাদ দেওয়াতে শুধু সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের মধ্যে সরকারবিরোধিতার ঝাঁজই বাড়িবে না; বৈষম্যের শিকার ইউনিয়ন পরিষদের বাসিন্দাদের মধ্যেও ন্যায়সংগত ক্ষোভ জাগ্রত হইতে পারে। প্রসঙ্গত, বর্তমান সংসদে বিরোধী জামায়াত জোট, ইসলামী আন্দোলন ও স্বতন্ত্র এমপির সংখ্যা ৮৫। ফলে উক্ত বিশেষ বরাদ্দবঞ্চিত ইউপির সংখ্যা আদৌ উপেক্ষণীয় নহে।

স্মরণ করা যাইতে পারে, ইতোপূর্বে সরকার জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের আসনে উন্নয়ন তদারকি এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের দায়িত্ব বিএনপির সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের দিবার সিদ্ধান্ত লইয়াছিল, যাহা সচেতন মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়াছিল। উক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলও সরকারের অংশ– এই চিরাচরিত রীতিকে উপেক্ষা করা হইলেও সরকার তাহা লইয়াই অগ্রসর হইয়াছিল। এই প্রেক্ষাপটেই আলোচ্য পদক্ষেপটি গৃহীত হইল। 

তবে এই সকল সিদ্ধান্ত যে অতীতে বিভিন্ন সরকার কর্তৃক বিরোধী পক্ষকে শাস্তি দিবার নামে প্রকৃতপক্ষে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসনের বাসিন্দাদেরই শাস্তি দিবার অগণতান্ত্রিক অপকৌশলের ধারাবাহিকতা– তাহা অস্বীকার করা যাইবে না। তাই বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের অঙ্গীকারবদ্ধ বর্তমান সরকারকে এই সকল ভ্রান্তি হইতে অবিলম্বে বাহির হইতে হইবে। তবে এই ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সহিত সচেতন নাগরিকদেরও দায়িত্ব রহিয়াছে বলিয়া আমরা মনে করি। নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ সমকালকে বলিয়াছেন, আলোচ্য সিদ্ধান্তটি যদি বিশেষ উদ্দেশ্যে একটি ইউনিয়নের সব মানুষের জন্য বরাদ্দ হয়, তাহা হইলে উহার কারণে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অবকাশ থাকিয়া যায়। এই ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন অবশ্যই যথাযথ পদক্ষেপ লইবে এবং এই বরাদ্দ বন্ধ রাখিতে বলিবে– তিনি এমন কথাও বলিয়াছেন। আমরা তাঁহার এই বক্তব্যকে স্বাগত জানাই। সচেতন মহলকেও এই বিষয়ে সোচ্চার হইতে হইবে।

আরও পড়ুন

×