ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী

এই বাংলাদেশ কি চেয়েছিলাম?

এই বাংলাদেশ কি চেয়েছিলাম?
×

হাফিজ উদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০

জাতি আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতীর পরম গর্ব। ১৯৭১ সালে বীর বাঙালি একটি দখলদার বাহিনীর সঙ্গে ৯ মাস যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছে। এটি একটি গৌরবদীপ্ত অধ্যায়। যারা ১৯৭১ সাল দেখেনি, তারা কল্পনাও করতে পারবে না বাঙালি তরুণরা কত সাহসী। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গ্রামীণ যুবকরা যে মাতৃভূমির জন্য বীরদর্পে লড়াই করতে পারে, সেটি প্রমাণ করে দিয়েছে মুক্তিবাহিনীর দামাল ছেলেরা।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ। একটি সামরিক বাহিনী অন্য একটি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে। কিন্তু কোনো সিভিলিয়ান পপুলেশনের সঙ্গে, জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে না। এটাই ছিল পাকিস্তানি আর্মির সবচেয়ে বড় ভুল। ২৫ মার্চ রাতে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে আক্রমণ করে। তারা ভেবেছিল, তাদের প্রতিরোধ করার মতো কোনো শক্তি এই জাতির নেই। কিন্তু তাদের সেসব ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআরের বাঙালি সৈনিকরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর প্রথমবার বাঙালিদের মোহমুক্তি ঘটে, যখন বাঙালিদের মাতৃভাষার দাবি অগ্রাহ্য করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা। বাঙালিদের রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বুকের রক্ত দিয়ে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের একটি কলোনির মতো শাসিত হচ্ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা সর্বদাই গণতন্ত্রপ্রিয়, ১৯৩৭ সাল থেকে ভোট দিতে অভ্যস্ত। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়ের পর বাঙালিদের নির্বাচিত সরকারকে দুই মাসও টিকতে দেওয়া হয়নি। মন্ত্রিসভা ভেঙে কেন্দ্র শাসিত শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বাঙালিদের মনে অনেক ক্ষোভ ছিল। ইয়াহিয়া, আইয়ুব খানের শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালিরা যুদ্ধ করে এসেছে গণতন্ত্রের জন্য। সবশেষে বাঙালিদের জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দাবি দেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণ এই ৬ দফাকে ধারণ করে, সমর্থন জানিয়ে ভোট দিয়েছে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদের। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান এই দলের সংসদ সদস্যরা। দেশবাসী আশা করেছিল, পাকিস্তানের শাসনভার বাঙালিদের কাছে হস্তান্তর করা হবে, সেটি তো
করেইনি বরং ২৫ মার্চ রাতে চাপিয়ে দিয়েছে বর্বর গণহত্যা।
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক সমস্যায় সামরিক সমাধান দিতে সিদ্ধহস্ত। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দাবিকে পদানত করে তারা যে ভয়াবহ মিলিটারি ক্র্যাকডাউন করে এতে বাংলাদেশের মানুষ হতবাক হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক নেতারা আত্মগোপনে চলে যান। এমনই এক দুর্যোগ মুহূর্তে পাকিস্তানিদের সব হিসাব-নিকাশ ভুল প্রমাণ করে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটি ব্যাটালিয়ন ও ইপিআরের সৈনিকরা বিদ্রোহ করে। চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের উপ-অধিনায়ক তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান প্রথমে নিজে এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
৩০ মার্চ ২০০ সৈনিক নিয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্টে বিদ্রোহ করি। ৮ ঘণ্টাব্যাপী তুমুল যুদ্ধের পর আমরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসি বিকেলের দিকে। বাইরে আসার পর জনতা আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরে স্বাগতম জানায়। তাদের কাছ থেকেই জানতে পারলাম বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআরের নেতৃত্বে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সেদিন যদি আমরা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বিদ্রোহ না করতাম, তাহলে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর মোকাবিলা করা বেসামরিক বাঙালির পক্ষে সহজ হতো না। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, সশস্ত্র সংগ্রামে যারা জীবন বিপন্ন করে যুদ্ধ করেছেন, সাম্প্রতিককালের ইতিহাসে তাদের কথা সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হয় না।
আমরা বিদ্রোহ করার পর হাজার হাজার তরুণ-ছাত্র-যুবকের দল বিভিন্ন স্থানে আমাদের কাছে ছুটে আসে। তারা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে গণহত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এবং মা-বোনের ইজ্জত রক্ষার ক্ষেত্রে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। তারা আমাদের বলে- অস্ত্র দেন, আমরা জীবনকে উৎসর্গ করতে চাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য। এ দৃশ্য যারা না দেখেছে তাদের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়, এই তরুণ-যুবকরা কতটুকু উদ্দীপ্ত হয়েছিল স্বাধীনতার আহ্বানে।
আমি যশোর-কুষ্টিয়া থেকে ৬০০ যুবককে ভর্তি করি আমার ব্যাটালিয়ন প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। এই ব্যাটালিয়নে আমিই একমাত্র বিদ্রোহী অফিসার ছিলাম। রিক্রুট করা ৬০০ সৈনিককে দেড় মাস ট্রেনিং দিয়েছি। এরা দুর্ধর্ষ যোদ্ধায় পরিণত হয়েছে। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল সবচেয়ে বেশি সাহসিকতা পদক অর্জন করেছে, একইভাবে শহীদের সংখ্যাও আমাদেরই সর্বাধিক। আমার এ ব্যাটালিয়নে তিন অফিসার- ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন, ক্যাপ্টেন মাহুবুবর রহমান এবং লে. আনোয়ার হোসেন সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। আমি নিজেও যুদ্ধে আহত হয়েছি। ৩০ মার্চ যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেছিলাম, ১৪ ডিসেম্বর সিলেটের এমসি কলেজের রণক্ষেত্রে সাফল্যের সঙ্গে তার পরিসমাপ্তি ঘটে।
এত বছর পর প্রশ্ন উঠতে পারে- মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা যারা অংশগ্রহণ করেছি আমাদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে। সেদিন আমরা মুক্তিযোদ্ধারা সবাই বয়সে তরুণ ছিলাম, মনে অনেক স্বপ্ন ছিল। আমরা চেয়েছিলাম একটি গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ যেখানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে, কোনো বৈষম্য থাকবে না। সব নাগরিক তার মৌলিক অধিকার ভোগ করবে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আজকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষ মৌলিক অধিকার ভোগ করতে পারে না। নাগরিকের বাকস্বাধীনতা নেই। সমাবেশের স্বাধীনতা নেই। সুযোগের সমতাও নেই।
একাত্তরে আমরা চেয়েছিলাম পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা। যেখানে নাগরিকের সাংস্কৃতিক মননের বিকাশ ঘটবে, শিক্ষার ক্ষেত্রে বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নতমানের শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন হবে, যেখানে প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রায় সমৃদ্ধি দৃশ্যমান হবে। কেবল উপরতলার গুটিকয়েক লোক আর্থিক সমৃদ্ধি ভোগ করবে আর সাধারণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দিনের পর দিন অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটাবে- এ ধরনের বাংলাদেশ আমরা চাইনি।
সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয়- দেশ থেকে গণতন্ত্র বিলুপ্ত হয়েছে। নারীরা নির্যাতিত হচ্ছেন। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। নির্বাচনের আগের রাতেই নির্বাচনের নামে প্রহসন মঞ্চস্থ হয়। রাজনীতিতে ব্যাপক দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে। প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা আমাদের সবাইকে পীড়া দেয়।
স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে কিছু আশাবাদও ব্যক্ত করতে চাই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের সাহস দেখেছি; সুতরাং আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্ম এবং আগামী প্রজন্ম মিলে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করবে।
যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি, যে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ছিল আমাদের চিন্তা-চেতনায় সদা জাগ্রত, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিশ্চয়ই জনগণের জন্য তা বাস্তবায়ন করবে। এ বিশ্বাস আমার রয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে একজন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি দেশবাসীকে অভিনন্দন জানাই।
মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম :ভাইস চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)

আরও পড়ুন

×