অকাতর অবকাশকেন্দ্র
সুন্দরবনে অসুন্দরের সদন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা তথা ‘ইসিএ’ হিসাবে সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার অঞ্চলের মধ্যে শিল্পকাঠামো নিষিদ্ধ হইলেও তথায় যেইভাবে অবকাশ-বাণিজ্য গড়িয়া উঠিয়াছে, উহা উদ্বেগজনক। মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিশ্ব ঐতিহ্যের পার্শ্বে প্রথম পর্যায়ে শুধু খুলনার দাকোপের ঢাংমারীতে কয়েকটা অবকাশ যাপনকেন্দ্র তৈয়ার হইলেও ধীরে ধীরে উহা মোংলার চিলা, বৈদ্যমারী, চাঁদপাই, সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জে সম্প্রসারণ ঘটিয়াছে। সাত-আট বৎসর ধরিয়া সুন্দরবনের কোল ঘেঁষিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে বিংশাধিক কেন্দ্র। এমনকি জমি ক্রয় করিয়া কিংবা ইজারা লইয়া নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন আরও দশাধিক।
অথচ গত বৎসরই অন্তর্বর্তী সরকার সুন্দরবন সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিল। উপরন্তু পরিবেশ আইনে ইসিএ এলাকায় স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞার সহিত অহেতুক বৃক্ষ কর্তনও নিষিদ্ধ। বাস্তবে খালপাড়ে অধিকাংশ রিসোর্ট তৈয়ার হইয়াছে বৃক্ষ কর্তনের মাধ্যমে। কয়েকটি স্থানে পুকুরও ভরাট করা হইয়াছে।
আমরা জানি, প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বিবিধ কারণে হুমকির সম্মুখীন। বস্তুত সুন্দরবন ঘিরিয়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন- ১৯৯৫ অনুসারে ১৯৯৯ সালে দেশের প্রথম ইসিএ ঘোষণা করা হইয়াছিল। এই বন সুরক্ষায় প্রতিবেশ অঞ্চলের চতুর্দিকে এই প্রকার পরিবেশ গড়িয়া তোলা জরুরি হইলেও উহার বাস্তবায়ন না হওয়া বিস্ময়কর। বিশ্বব্যাপী বটেই, প্রতিবেশী ভারতেও বন ও বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণ কৌশল হিসেবে এই সীমারেখা ১০ হইতে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হইয়া থাকে।
সুন্দরবন যদ্রূপ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ন্যায় দুর্যোগে আমাদের প্রাকৃতিক বর্মরূপে ভূমিকা পালন করিয়া থাকে; তদ্রুপ উহার বনজসম্পদ দেশের অর্থনীতিতে বিপুল অবদান রাখিয়া চলিতেছে। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল ও রামসার সাইটের মর্যাদাপ্রাপ্ত সুন্দরবন ইতোমধ্যে যথেষ্ট ক্ষতির সম্মুখীন; নূতন করিয়া মনুষ্যসৃষ্ট অবিমৃষ্যকারিতা রোধ করিবার বিকল্প নাই। তজ্জন্য একাদিক্রমে হোটেল ও অবকাশকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ করিতে হইবে সর্বাগ্রে। অকাতরে এহেন বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা নির্মাণ করিতে দিয়া সুন্দরবনকে অসুন্দরের সদনে পরিণত হইতে দেওয়া যাইবে না।
আমরা দেখিয়াছি, দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের সৈকতে অবাধ যাতায়াত, উচ্চ শব্দে গান-বাজনা ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটকের কারণে দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ ঝুঁকির সম্মুখীন। অবশেষে সেন্টমার্টিন দ্বীপ এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত; যথায় বৎসরের ১০ মাসই সেন্টমার্টিনে পর্যটক নিষিদ্ধ। সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও অবকাঠামো নির্মাণের উপর নিষেধাজ্ঞা, তৎসহিত পর্যটকদের ব্যাপারেও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করিতে হইবে।
অস্বীকার করা যাইবে না, সুন্দরবন ঘিরিয়া পর্যটন ব্যবসার প্রসার ঘটাইতে হইবে; তবে উহা অবশ্যই বন ও বন্যপ্রাণীর পরিবেশ সুরক্ষিত রাখিয়া। সেন্টমার্টিনের ন্যায় আত্মঘাতী তৎপরতা সুন্দরবনেও চালাইয়া যাইতে দেওয়া উচিত হইবে না। তজ্জন্য রিসোর্ট তৈয়ারের পূর্বে ও পরে বনের উপর প্রভাব নিরূপণ প্রয়োজন। নৌযানে লাগামছাড়া পর্যটন ব্যবসাকে নীতিমালা করিয়া নিয়ন্ত্রণে আনা হইলেও উহার বাস্তবায়ন লইয়া শঙ্কা রহিয়াছে। তাহার পরও অনুমতি ব্যতিরেকে এখন বনের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট আয়তনের লঞ্চ ও নির্দিষ্ট সংখ্যার বাইরে পর্যটক প্রবেশ করিতে পারে না বলিয়া কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আসিয়াছে। রিসোর্টের ক্ষেত্রে একই ধরনের নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
পর্যটনকে প্রাধান্য দিতে গিয়া যেন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য ক্ষুণ্ন না হয়। পর্যটকের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসন সুবিধা প্রয়োজন হইলেও উহাতে অবশ্যই বিদ্যমান আইন, পরিবেশগত বিধিবিধান ও ইসিএর নীতিমালা অনুসরণ করিতে হইবে। সুন্দরবনের ন্যায় সংরক্ষিত বনে অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ নিষেধ হইলেও যেইভাবে রিসোর্টে আগত পর্যটকগণ অবৈধভাবে বন ও খালে প্রবেশ করিয়া থাকেন এবং তাহারা যে পরিবেশবিনাশী কারবার করেন, উহাও নিয়ন্ত্রণ অত্যাবশ্যক।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়