ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

সরকারি চাকুরি

প্রশ্নবিদ্ধ গোয়েন্দা যাচাই পদ্ধতি

প্রশ্নবিদ্ধ গোয়েন্দা যাচাই পদ্ধতি
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি বিসিএস ও প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে যেইভাবে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উল্লেখযোগ্য অংশকে বাদ দেওয়া হইয়াছে, উহা উদ্বেগজনক। প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক হিসাবে নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে সুপারিশকৃতদের মধ্য হইতে কয়েকশ জনকে বাদ দিবার খবর গত সপ্তাহে প্রকাশ হইবার পর হইতেই দেশজুড়িয়া প্রতিবাদের মুখে সরকার সকলকে নিয়োগের অঙ্গীকার করে। ইহার মধ্যেই বুধবার ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে চল্লিশের অধিক প্রার্থীকে অনুরূপভাবে বাদ দিবার খবর বিস্ময়কর বটে! এহেন সিদ্ধান্তে সামাজিক মাধ্যমে যদ্রূপ সরকারের সমালোচনা হইয়াছে, তদ্রূপ প্রতিবাদ হইয়াছে মাঠপর্যায়ে। অবশেষে সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিসিএসে বাদ পড়াদের নিয়োগের ঘোষণা দিয়াছেন। দুই ক্ষেত্রেই সরকার যখন পুনরায় নিয়োগ দিবার ঘোষণা দিয়াছে, তবে তাহাদের বাদ দেওয়া হইয়াছিল কেন?

বিস্ময়কর হইলেও সত্য, ঊনপঞ্চাশতম বিসিএসে বুধবারের গেজেটে যাহারা বাদ পড়িয়াছেন, তাহাদের অনেকেই স্বীয় বিষয়ে মেধাক্রমে প্রথম হইয়াছিলেন। এমনকি তাহাদের অনেকেই সক্রিয়ভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। এই অভ্যুত্থানের প্রধান আকাঙ্ক্ষাই ছিল সকল প্রকার বৈষম্য হইতে মুক্তি। আওয়ামী লীগের সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় যেইভাবে সরকারি চাকরি হইতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যাচাইয়ের নামে সুপারিশকৃতদের বাদ দেওয়া হইত, সেই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধেও মানুষ রাস্তায় নামিয়াছিল। যাচাইয়ের নামে বাদ দিবার সেই বঞ্চনার পুনরাবৃত্তি কেহই দেখিতে চাহে না। 
কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ না থাকিলে কেবল পুলিশ বা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কাউকে নিয়োগবঞ্চিত করিবার সুযোগ নাই। আমরা জানি, বর্তমানে সরকারি চাকুরি কতখানি প্রতিযোগিতাপূর্ণ। যেইখানে প্রার্থীদের দীর্ঘদিনের পড়াশোনা-প্রস্তুতি ও কয়েক ধাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবার পর কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসে। বিসিএসের ন্যায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রারম্ভিক, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবার পরই নিয়োগের সুপারিশ মিলে। সেই সুপারিশের পরও প্রার্থীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যাচাইয়ের নামে বাদ দিবার প্রচেষ্টা কেন?
বস্তুত এই চিত্র চূড়ান্ত নিয়োগের পূর্বে পুলিশি যাচাইয়ের প্রচলিত ব্যবস্থা লইয়াই প্রশ্ন তুলিতেছে। আমরা দেখিয়াছি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জনপ্রশাসনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণে গঠিত সংস্কার কমিশনে শুধু ফৌজদারি মামলার তথ্য চাইবার প্রস্তাব করা হয়। প্রয়োজনে মন্ত্রণালয় দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রতিবেদন চাইতে পারে। দুঃখজনক হইলেও সত্য, সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার যদ্রূপ অবহেলা করিয়াছে, তদ্রূপ বর্তমান সরকার হইতেও সেই সদিচ্ছা দেখা যায় নাই। আমরা মনে করি, সরকারি চাকুরিতে পুলিশ বা গোয়েন্দা যাচাইয়ের নামে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের অবসান ঘটাইতে হইবে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমরা চাই, সরকারের প্রতিশ্রুতির আলোকে বাদ পড়া প্রাথমিক শিক্ষক ও বিসিএসের প্রার্থীদের দ্রুত নিয়োগের ব্যবস্থা করা হইবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে তাহাদের যেন কোনো ভোগান্তি না হয় এবং একজনও যেন বাদ না পড়েন। ইহার সহিত কেন এত প্রার্থী বাদ পড়িল, উহার কারণও অনুসন্ধান করিতে হইবে। আমরা দেখিয়াছি, প্রাথমিকের শিক্ষকগণের পুলিশি যাচাই-বাছাইয়ের পূর্বেই শিক্ষামন্ত্রী বলিয়াছেন, কাউকেই তাহারা বাদ দিতে চান না। এমনকি শত শত শিক্ষক যখন বাদ পড়িয়াছেন তখনও তিনি যাচাইয়ের বিষয়টি স্বীকার না করিয়া অন্য কারণ দেখাইয়া তাহাদের নিয়োগের অঙ্গীকার করিয়াছেন। বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সাংবাদিকদের নিশ্চয়তা দিয়াছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাহারও প্রতি কোনো বৈষম্য করা হইবে না এবং সোমবার অবশিষ্টগণের প্রজ্ঞাপন জারি হইবে। 
আমরা চাই, সরকারের সাম্প্রতিক এই দুই নিয়োগের অভিজ্ঞতা তাহাদের জন্য শিক্ষণীয় হইয়া থাকুক। ভবিষ্যতে যেন এহেন ভোগান্তিতে কোনো প্রার্থী না পড়েন। এহেন বৈষম্যের চির অবসানে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি। 

আরও পড়ুন

×