ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশেষ লেখা

অসামান্য মধুকণ্ঠ

অসামান্য মধুকণ্ঠ
×

লতা মঙ্গেশকর - সংগৃহীত

রুনা লায়লা

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ০১:০২

যার গান শুনে নিজের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসে, সেই অসামান্য গায়িকা লতা মঙ্গেশকর এই পৃথিবীতে আর নেই। গান শোনেন অথচ লতা মঙ্গেশকরের গান ভালোবাসেন না- এমন শ্রোতার সংখ্যা সত্যিই বিরল। সাত দশকের বেশি সময় ধরে তিনি হিন্দি ও বাংলা গানের দুনিয়ায় রাজত্ব করেছেন। কঠিন রাগাশ্রয়ী গান, হালকা ধ্রুপদি সুর থেকে চটুল ফিল্মি গান- সবকিছুতেই তার প্রতিভা, দক্ষতা ও শ্রোতার মন কাড়ার ক্ষমতা ছিল প্রশ্নাতীত। তার কণ্ঠ আমার মতো লাখো মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।

তিনি এখন স্বর্গের উদ্যানে গান গাইছেন!

লতাজির সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলাম। একসময় বয়সের ব্যবধান পেরিয়ে আমি তার বন্ধুও হয়ে উঠি। প্রায়ই ভিডিওতে কথা বলতাম। দীর্ঘ সময় ধরে চলত আমাদের কথোপকথন। পরিবারিক কথার বাইরে বেশিরভাগ সময়ই কথা হতো সংগীত নিয়ে। তার অনুমতি নিয়ে, তাকে নানা ধরনের জোকস পাঠাতেও সাহস করেছিলাম। যা তিনি খুবই উপভোগ করতেন। আমি তাকে দিদি বলে ডাকতাম, আবার লতাজিও বলতাম।

লতা মঙ্গেশকরের সেন্স অব হিউমার ছিল অসামান্য। হাস্যরসের দুর্দান্ত সব অনুভূতির কথা তিনি বলতেন। আমি মুগ্ধ হয়ে তা শুনতাম আর হাসতাম। তার কথা শুনতেও ভালো লাগত। তার প্রতিটি কথাই আমার সংগীত বলে মনে হতো। প্রায় সকালেই তাকে গুড মর্নিং জানালে, উত্তরে তিনি আমাকে তার পছন্দের জিনিসগুলোর ছবি পাঠাতেন। পাশাপাশি ফুল, প্রকৃতি বা তার গানের অডিও এবং ভিডিও পাঠাতেন। যার বেশিরভাগই আমি ইতোমধ্যে শুনেছি এবং মুখস্থ করেছি। তার কাছ থেকে আসা উপহারের তালিকায় অন্যতম ছিল- শাড়ি। প্রতি বছর আমার জন্মদিনে তিনি আমাকে শাড়ি পাঠাতেন। এই তো গেল জন্মদিনের দিন তিনি বললেন, যেহেতু লন্ডনে যাচ্ছো, ঢাকায় ফিরে এলে আমি উপহার পাঠাব। আমরা যখন শেষ কথা বলেছিলাম, লন্ডনে আসার ঠিক আগে তিনি আমাকে বলেছিলেন, আমার সঙ্গে কথা বলতে তিনি পছন্দ করেন এবং যখন আমরা কথা বলি, তখন মনে করেন আমি তার পরিবারের খুব কাছের একজন সদস্য।

২০১৯ সালে আমার 'রুনা লায়লা ফিচারিং লিজেন্ডস ফরএভার' অ্যালবামের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন কিংবদন্তি এই সংগীতশিল্পী। এক অডিওবার্তায় তিনি পরিস্কার বাংলায় বলেন, 'নমস্কার রুনা। কেমন আছ তুমি, ভালো?' এরপর হিন্দিতে বলেন, 'রুনা, আমি গান শুনেছি, খুব ভালো লেগেছে। খুব ভালো গেয়েছ তুমি। ভালো তো গাও-ই তুমি। তবে এবার তুমি মিউজিক ডিরেক্টরও হয়ে গেলে। এটা খুবই খুশির খবর। মিউজিক ডিরেক্টর হওয়ার পর তুমি যে গানগুলো তৈরি করেছ, সেগুলো আমার শুনে খুব ভালো লেগেছে। তোমার কাজ খুব ভালো হচ্ছে।' তিনি বলেন, 'রুনা, তোমাকে হয়তো এটা বলা ঠিক হচ্ছে না, যেহেতু তুমি একজন তৈরি শিল্পী এবং বুঝে গান কর। আমি নিশ্চিত, তোমার এই কাজটাতেও তুমি সফল হবে। তুমি যে পথে চলা শুরু করেছ, সেটা কঠিন। কিন্তু তোমার জন্য কঠিন নয়। তোমার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা রইল। তুমি অনেক বড় মিউজিক ডিরেক্টর হও। আমি সব বাংলাদেশি মানুষকে প্রণাম জানাই এবং রুনা তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসা ও নমস্কার।'

তিনি আমাকে তার ছোটবোন মনে করতেন সবসময়। আমার প্রতিটি কাজের বিষয়েও খোঁজখবর রাখতেন। এই তো সেদিন ফোন করে বললেন, তিনি আমাকে অনেক মিস করেছেন। আমি বলেছিলাম, পরিস্থিতির উন্নতি হলে আমি আপনাকে দেখতে যাব। আমার যাওয়া হলো না। লতা দিদির সঙ্গে কাটানো সময়গুলো আমার সঙ্গে থাকবে চিরকাল। তার সেই সুন্দর কণ্ঠ আর শুনতে পাব না, 'রুনাজি আপ ক্যাসি হ্যায়?' লতা দিদির মুম্বাইয়ের বাড়ি প্রভাকুঞ্জে যতবার গিয়েছি, ততবার দারুণ আতিথেয়তা পেয়েছি। আমি কোনো কাজে মুম্বাই গিয়েছি, জানলেই তিনি নিমন্ত্রণ পাঠাতেন। সত্যিই সেই সন্ধ্যাগুলো ভোলার মতো নয়। তিনি আমাকে সবসময় আশীর্বাদ করেছেন। তার পাঠানো শেষ ভয়েস বার্তাগুলো কানে বাজছে।

আজ লতা মঙ্গেশকরকে মূল্যায়নের দিন নয়। তার গান সম্পর্কে পণ্ডিতরা বলবেন। তবে আমি বলতে পারি, এই উপমহাদেশে কমপক্ষে গত ৬০ বছর মানুষের কান ও মন তৈরি করেছেন লতা মঙ্গেশকর। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্ত- শ্রেণি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের প্রিয় শিল্পী লতা দশকের পর দশক একই মধুকণ্ঠে মানুষকে তুষ্টি দিয়েছেন। এর কোনো তুলনা নেই। লতার মধুকণ্ঠ চির নবীনা, ৮৫ বছর বয়সে তিনি ১৬ বছরের কিশোরীর ঠোঁটেও মানানসই হতেন। তার কণ্ঠের জাদু যে কোনো বয়সী মানুষকে আর্দ্র করে তোলে, বেদনা-আনন্দ বা হাহাকার লতার কণ্ঠের পূর্ণতায় শ্রোতাদের সম্পূর্ণ মগ্ন করে তোলে। এই শিল্পী চির অমর- মানুষমাত্রই মরণশীল, প্রত্যেকেই যেতে হয়; হবে। লতা মঙ্গেশকরেরও দেহাবসান হলো, তবে এই মধুকণ্ঠ রয়ে যাবে আরও অনাগত বহুকাল। কারণ, এ এমনই কণ্ঠ, যা সত্যিকারের চির নবীনা, চির মধুময়। ব্যক্তিগতভাবে আমার দুঃখ হলো, অসম্ভব আন্তরিক, নম্র, রসিক ও সুন্দর এই মানুষটিকে আর কোনো দিন চোখে দেখব না।

আরও পড়ুন

×